Quantcast
Channel: সুফিনিউজ২৪

সূফী দরবেশদের অবদান

$
0
0

বিভিন্ন সময়ে শত শত সূফী দরবেশগণ ও তাদের অনুগামী শিষ্যরা ভারত উপমহাদেশে আগমন করেন। এবং বিভিন্ন শহর ও গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েন ইসলাম প্রচারের জন্য। মুসলমানদের মানসিক ও নৈতিক উন্নতি উৎকর্ষ বিধানে সুফিদের কৃতিত্ব ছিল মুসলিম সেনাপতি বিজেতা ও শাসকবর্গ অপেক্ষা অনেক বেশি স্থায়ী ও কার্যকর। তাদের ধর্মীয় অনুরাগ ধর্ম প্রচারের আগ্রহ মানব হিতৈষীমূলক কার্যাবলী ছাড়াও জনমানসকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেন এবং ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করেন।

ইসলামের প্রথম যুগে আবর মুসলমানদের মধ্যে সুফিদের উৎপত্তি ঘটলেও পারস্যেই এর মূল প্রসার ঘটেছিল। এরপর ধীরে ধীরে সুফিরা বিভিন্ন সময়ে ভারত বর্ষে এসে বিভিন্ন তরিকার মাধ্যমে তাঁদের মরমী কার্যাবলী প্রচার করেন।

সুফিবাদ পরিচিতিঃ
পরম সত্তাকে জানার জন্য অনন্তকাল ধরে মানুষের মধ্যে রয়েছে এক অদম্য আকাঙ্খা। তাই মানুষ যুগে যুগে আধ্যাত্মিক অভিযান চালিয়েছে। এ পরম সত্তাকে আবিষ্কার করে তাঁর সাথে নিবিড় সম্পর্ক স্থাপন করতে, পরম সত্তাকে জানার এ প্রয়াসকে ইসলামে বলা হয় সুফিবাদ। সুফিবাদ হচ্ছে ইসলামী এমন একটি পথ যে পথে কঠোর ধ্যান ও প্রার্থনার মাধ্যমে স্রষ্টার ভালবাসা পাওয়া যায় এবং সাথে নিজের আত্মার উন্নয়ন। স্রষ্টার প্রতি তীব্র ভালবাসার মাধ্যমে মানুষের আত্মোন্নয়নই হচ্ছে সুফিবাদের মূল কথা। ঈশ্বর সত্তার সঙ্গে নিজেকে লীন করে দেয়ার মধ্যেই সুফিবাদের পরম পাওয়া।

অধ্যাপক ম্যাসিগনোঁ বলেন, সুফিবাদ বা মরমীবাদী আন্দোলন এসেছে আদিম মুসলমানদের অতিরিক্ত কঠোর সংযমের প্রত্যক্ষ উত্তরাধিকার সুত্র। আবার আদিম আরবী এবং পার্সিয়ান উৎস হতে জানা যায় যে, সুফিবাদ হল জীবনের একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য যা নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর পরপরেই এটি প্রসারিত বা বিস্তৃত না হয়ে খুবই ধীরে ধীরে বিস্তৃতি লাভ করে। ইসলামের চতুর্থ খলিফা হযরত আলী (রাঃ) এর খেলাফতের অবসানের পরে সুফিবাদ প্রকাশিত হয়। এ সময় শাসকদের মধ্যে যুদ্ধ-বিগ্রহ থাকায় কিছু উলেমা, নবী ও খলিফাদের আদর্শ নিয়ে এই পথ চলে আসে।

সুফি শব্দের উৎসঃ ‘সুফি’ নামটি সাধারণত ইসলামের মরমীবাদী ও সাধু পুরুষদের নামের সঙ্গে জড়িত। সুফি শব্দটির উৎপত্তি নিয়ে পন্ডিতদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। এ সম্পর্কে প্রধানত ৫টি মত রয়েছে।

১. ‘সুফি’ শব্দটি আরবী সুফা শব্দ থেকে এসেছে। সফ অর্থ কাতার বা সারি। এ মতের অনুসারীরা বলে থাকেন যে, সুফিগণ মুসলিম বিশ্বের প্রথম সফ বা সারির লোক বিধায় তাদেরকে সুফি নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে। তাছাড়া কিয়ামতের দিনে মানুষ তাদের বিশ্বাস কার্যানুযায়ী বিভিন্ন কাতার বন্দী বা অগ্রবর্তীদের দলভূক্ত হবেন। সুফি পদটি তাঁদের এরূপ মর্যাদার নির্দেশক।

২. কারো কারো মতে ‘সুফি’ শব্দটি ‘আহলে সুফফা’ থেকে এসেছে। মহানবী (সাঃ) এর সময়ে মদীনায় আহলে সুফফার প্রায় ৫০০ সাহাবী ছিলেন যাদের কোন পার্থিব আকর্ষণ বা উৎসাহ ছিল না। তাদের জীবন যাপনের সাথে সুফিদের জীবনের যথেষ্ট মিল রয়েছে।

৩. কারো কারো মতে, সুফিরা ‘সুফ’ নামে এক প্রকার রঙ্গীন পোশাক পশমের পোশাক পরিধান করতেন বলে এটি তাদের পরিচয় সূচক নাম।

৪. কোন কোন পন্ডিতের আরবী ‘সাফা’ অর্থ পবিত্রীকরণ তাঁদের মতে, সুফিরা ছিলেন পবিত্র চরিত্রের অধিকারী এবং তারা পবিত্র এর উপর জোর দিতেন বেশি।

৫. অধ্যাপক নিকলসন সহ কিছু সংখ্যক পাশ্চাত্য পন্ডিত মনে করেন -‘সুফি’ শব্দটি গ্রীক সার্কোস শব্দ থেকে এসেছে। যার অর্থ জ্ঞানের প্রতি অনুরাগ ছিলেন।

যাহোক আধুনিক পন্ডিতদের গ্রহণযোগ্য মত এই যে, ‘সুফ’ শব্দই সুফি বা তাসাউফের মুল।

প্রথম সুফি নামধারী :
সুফি শব্দটি খ্রীস্টীয় অষ্টম শতকের দ্বিতীয়ার্ধে কুফার জারির বিন হাইয়ান নামক একজন রাসায়নিক পেশাধারী সাধক এবং আবু হাশিম নামক একজন সাধকের নামে সর্বপ্রথম ব্যবহৃত হয়।

প্রাথমিক যুগের সুফিঃ যদিও প্রাথমিক যুগে সুফিবাদ ভালভাবে সংগঠিত হতে পারে নি, কিন্তু তাদের কিছু অবদান লক্ষ্য করা যায়। প্রাথমিক যুগের কয়েকজন সুফিরা হলেন – বসরার হাসান প্রাথমিক যুগের সুফি বলে পরিচিত। তার মন ধ্যান ধারণায় আল্লাহর ভয় ছিল এবং জীবনে কখনো পাপ কাজ করার উদ্রেক দেখা যায় নি।

কুফার সুফি আবু হাশেমকে ধরা হয় তিনিই প্রথম মরমী এবং ঐ সময় থেকে সুফি নাম ব্যবহার করা হয়। তিনি বিশ্বাস করতেন সুফিদের মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ গুণ হচ্ছে আত্মশুদ্ধি।

ইব্রাহিম বিন আদহম ছিলেন বলখ এর রাজা, যিনি তার অধিকারভূক্ত সিংহাসন ছেড়ে সন্ন্যাস জীবন গ্রহণ করেন।

বসরার রাবিয়া ছিলেন প্রথম মহিলা সুফি সাধক। যিনি ধার্মিক জীবন পালন করতেন এবং দাসের মত খুবই পরিশ্রমী ছিলেন। তিনি বলতেন আল্লাহর প্রেম আমাকে এত বেশি নিমগ্ন করেছে যে, আর কারো কোন প্রেম বা ঘৃণাই আমার অন্তরে নেই।

বায়েজিদ বোস্তামি তার “Pure love by denying one’s own self.”ধারণার জন্য বিখ্যাত। প্রাথমিক পর্যায়ের সুফিবাদ আল্লাহর ভীতি ও শেষ বিচারের দিনের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। কিন্তু কালক্রমে এই ধারণার পরিবর্তন আসে এবং প্রেমের মধ্য দিয়ে প্রিয়তম আল্লাহর সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের ভিত্তিরূপে পরিগণিত হয়। দশম শতক থেকে সুফিবাদ মূলস্থান থেকে সরে আসতে থাকে সর্বেশ্বরবাদের দিকে।

ভারতবর্ষে বিভিন্ন সুফি তরিকাঃ
সুফি সাধনার অনুসৃত পথ বা পদ্ধতিকেই তরিকা বলা হয়। প্রতিটি তরিকাই এক বা একাধিক বিশিষ্ট সুফি নির্দেশিত সাধন পদ্ধতি ধারণ করে আছে। খ্রীস্ট দশম শতাব্দীতে সুফিদের সাধন পদ্ধতি অর্থাৎ আধ্যাত্মিক অনুশীলনকে নিয়ন্ত্রিত করার জন্যে বিভিন্ন তরিকার উদ্ভব ঘটে। এই সব তরিকার প্রতিষ্ঠাতা কোন সুফি সাধকগণ হলেও মূলত সব তরিকাই শেষ পর্যন্ত কোন তাবেয়ী বা সাহাবীর মাধ্যমে মহানবী (সাঃ) এর সাথে যুক্ত হয়েছে। সুফি সাধনার জগতে অসংখ্য তরিকা রয়েছে। পুরাতন-নতুন মিলে বর্তমানে সাধনার জগতে প্রায় ২০০ এর অধিক তরিকা রয়েছে। এগুলোর মধ্যে নিম্নোক্ত তরিকাগুলো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

চিশতিয়া তরিকাঃ
ভারতে দীক্ষিত সংঘের মধ্যে সবচেয়ে পুরাতন হল চিশতিয়া তরিকা। এর প্রতিষ্ঠাতা নিয়ে মতবিরোধ আছে। কারো মতে, হযরত আলীর নবম অধ:স্তন পুরুষ আবু ইসহাক এই তরিকার প্রতিষ্ঠাতা। আবার কারো মতে, খাজা আবদাল চিশতি এই তরিকার প্রতিষ্ঠাতা। খাজা মুঈন-উদ্দিন চিশতী চিশতিয়া তরিকাকে ভারত উপমহাদেশে আনয়ন করেন। তিনি পাক-ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সুফিরূপে প্রসিদ্ধি লাভ করেন এবং আফতাব-ই-মূলক হিন্দি অর্থাৎ হিন্দুস্তানের সূর্য উপাধিতে ভূষিত হন। তিনি ১১৪২ খ্রী. সিসতানে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বিখ্যাত সুফিদের সান্নিধ্য লাভ করেন। ১১৯২ সালে মু. ঘুরী দিল্লি অধিাকর করলে ১১৯৩তে খাজা মুঈন-উদ্দিন ভারতে আসেন এবং আজমীরে গিয়ে খানকাহ স্থাপন করে ইসলাম প্রচারের ব্রতী হন। বাকী জীবন এখানে কাটিয়েছেন। তার মৃত্যুর পর আজমীরে তার দরগাহ তীর্থক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।

বাংলা-পাক-ভারতে চিশতিয়া তরীকা অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠে। তাঁর প্রধান খলিফা ছিলেন খাজা কুতব উদ্দিন বখতিয়ার কাকী; যিনি দিল্লিতে বসবাস করতেন এবং ইলতুৎমিশ তাকে খুব শ্রদ্ধা করতেন কুতব মিনারের কাছে তাকে সমাহিত করা হয় এবং এটি তীর্থকেন্দ্রে পরিণত হয়। দিল্লির পরবর্তী বিখ্যাত চিশতি সুফি হলেন শেখ নিজাম উদ্দিন আউলিয়া, তাঁর খানকাও তীর্থকেন্দ্রে পরিণত হয়। তাঁর প্রধান শিষ্য ছিলেন শেখআঁখি সিরাজ যিনি বাংলাদেশে চিশতিয়া তরিকা জনপ্রিয় করে তোলেন।

প্রকৃতি :
চিশতিয়া তরিকার ‘ইল্লাল্লাহ’ শব্দ জপ করার উপর বিশেষ জোর দিতেন। তাঁরা উপাসনার সময় সমাগম করতেন এবং রঙ্গিন বস্ত্র পরিধান করতেন, কেউ মুরীদ হতে গেলে তাকে প্রথমে দুই রাকাত নামাজ পড়তে হয় এবং বিভিন্ন বিষয়ে উপদেশ দেওয়া হয়। অতঃপর মুরীদকে কতগুলো আল্লাহর নাম শিখানো হয় এবং কোন দরগায় গিয়ে ৪০ দিন সিয়াম পালনের আদেশ দেওয়া হয়। অবশেষে তাকে তরিকার পরিচয় দেওয়া হয়। আফিং, ভাঙ্গঁ, তামাক, মাদকদ্রব্য ইত্যাদি চিশতিয়া সুফিদের জন্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। মোঘল যুগে এই তরিকার দরবেশদের মধ্যে অন্য্যতম ছিলেন শেখ সেলিম, এরপর চিশতিয়া তরিকা কয়েকটি উপভাগে ভাগ হয়।

সোহরাওয়ার্দী তরীকাঃ
শেখ নজিব উদ্দিন আব্দুল কাদির এই তরিকার প্রতিষ্ঠাতা। তিনি নিজামিয়া কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন এবং হাদিস শাস্ত্রো বিশেষভাবে বুৎপন্ন ছিলেন। তাঁর পরে তার ভ্রাতুষ্পুত্র শাহাব উদ্দিন উমর বিন আব্দুল্লাহ এই তরিকার প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা বলেন। সোহরাওয়ার্দী তরিকা ভারতে বিস্তার লাভ করে শেখ বাহাউদ্দিন জাকারিয়ার হাত ধরে ১২৬৭ সালে। তিনি পিতার মৃত্যুর পর খোরসনে শিক্ষাগ্রহণের পর পন্ডিত হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। এরপর তিনি মক্কায় মুহাম্মদ (সাঃ) এর কবরের সেবক হিসেবে ৫৩ বছর অবস্থান করেন। পরে তিনি শাহাব উদ্দিনের কাছ থেকে দীক্ষা লাভ করেন।

শায়খ শিহাব উদ্দিন ভারতে সুফি তরিকা প্রচারের জন্য দায়িত্ব অর্পন করেন শায়খ বাহাউদ্দিনের উপর। তিনি এ দায়িত্ব শুধু মুলতানে প্রচার করেন নি বরং পাশ্ববর্তী বেলূচিস্তানসহ অন্যত্র পৌছিয়েছেন। ইলতুৎমিশ তাঁকে শেখ উল-ইসলাম উপাধিতে ভূষিত করেন। শেখ শাহাব উদ্দিনের আরেকজন শিষ্য শেখ জালাল উদ্দীন তাবরেজী মুলতান ও দিল্লির মধ্য দিয়ে বাংলায় এসে এই তরিকার প্রচার কার্য চালিয়ে যান।

শাত তারিয়া তরিকাঃ
ভারতে এই তরিকা প্রচার করেন সৌদি সুলতানদের আমলে শেখ সিরাজ উদ্দিন আব্দুল্লাহ শাত্তারী। শাত্তার শব্দের অর্থ ভ্রমন করা। আর সুফি মতের ভাষায় ইলম শাত্তারিয়া অর্থ আত্মার সঞ্চালন ও উচ্চাকাঙ্খা বুঝায়। মোঘল সম্রাট হুমায়ুন শাত্তারিয়া তরিকা গ্রহণ করেন সৈয়দ মুহাম্মদ গাউছের কাছ থেকে। আবুল ফজলের “আইন-ই-আকবরী” গ্রন্থে এই তরিকার উল্লেখ আছে। জৌনপুর ও বিহারে এই তরিকার সুফিদের বেশ প্রভাব ছিল। সিরাজ উদ্দিন আব্দুল্লাহর প্রধান শিষ্য ছিলেন শায়খ ওয়াজী উদ্দিন গুজরাটি। তাঁর সমাধি আহমেদাবাদে অবস্থিত যেখানে নুরজাহান কর্তৃক শাহ পীরের মাজার নির্মিত হয়েছে। এই তরিকার সুফিরা তাওহীদের উপর বিশেষরূপে জোর দিতেন এই জন্য তাঁরা ‘ফনা’ বা ফনা ফিল ফনা বিশ্বাস করতেন না, কেননা ফনা তাওহীদের বিপরীত।

কাদেরীয়া তরিকাঃ
হযরত মুহীউদ্দিন আব্দুল কাদের জিলানী এই তরিকার প্রতিষ্ঠাতা। তিনি ১০৭৭-৭৮ সালে জিলান জেলায় জন্মগ্রহণ করেন এবং ১১৬৬ সালে বাগদাদে পরলোকগমন করেন। এই তরিকা ভারতে ব্যাপক জনপ্রিয় ও প্রভাবিত হয়ে উঠে। কাদেরিয়া তরিকা হযরত আব্দুল্লা কাদেরের জীবদ্দশাতেই বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠে এবং তার মৃত্যুর পর তাঁর শিষ্যরা এই তরিকা সারা মুসলিম জাহানে বিস্তার করে। বিভিন্ন স্থানে এই তরিকার সুফিরা বিভিন্ন জিনিসকে তাঁদের তরীকার প্রতীকরূপে ব্যবহার করেন। যেমন- তুরস্কের মুসলমানরা সবুজ গোলাপ ফুলকে প্রতীকরূপে গ্রহণ করেন এবং পাক-বাংলা-ভারতে তাঁর জন্মদিনে উৎসব পালন করা হয়।

প্রকৃতিঃ
হযরত আব্দুল কাদের রচিত “ফুয়ুদত-আল-রব্বানীয়া” গ্রন্থে দেখা যায় যে, কোন লোক কাদেরীয়া তরিকা গ্রহণ করতে চাইলে তাঁকে দিনে সিয়াম পালনে এবং রাত্রে আল্লাহর উপাসনায় মশগুল থাকতে আদেশ দেওয়া আছে। এই অবস্থায় তাকে ৪০ দিন থাকতে হয়। পরবর্তীতে এই তরিকা বানাগাজী মু. গাউস প্রচার করেন। এই তরিকার প্রমাণ বহন করে “শাখিনতে উল আউলিয়া মায়ানমির” এর সমাধি কমপ্লেঙ্। এই তরিকা কোরআন ও হাদিস অনুযায়ী পারিবারিক জীবন পরিচালনা করতে উৎসাহী করে তোলে।

নকশবন্দীয়া তরিকাঃ
এই তরিকার প্রতিষ্ঠাতা হলেন তুর্কিস্তানের মু. বিন মুহাম্মদ বাহাউদ্দিন আল বোখারী (১৩১৭ – ১৩৮৯ খ্রী.পু.)। নকশবন্দ শব্দের অর্থ চিত্রকর। এই তরিকার সুফীরা আল্লাহর মহিমার চিত্র হৃদয়ে ধারণ করতেন বলে তাদেরকে নকশবন্দীরা বলা হত। ভারতে এর প্রচারক হলেন খাওয়াজ মু. বাকী বিল্লাহ যার সমাধি দিল্লিতে অবস্থিত। এরপর এই তরিকার প্রচারক ছিলেন শায়খ আহমেদ ফারুকী শবহিন্দী। সম্রাট জাহাঙ্গীরও তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন এই তরিকা অনেক পূর্বে প্রতিষ্ঠিত হলেও ভারতে অনেক পরে প্রবেশ করে। এছাড়াও ভারত উপমহাদেশের প্রধান প্রধান তরিকাগুলোকে কেন্দ্র করে কিছু সংখ্যক উপতরিকা পাওয়া যায়।

বাংলায় সুফিবাদ ও সুফি আগমনের প্রেক্ষাপটঃ

ইসলাম অধ্যুষিত পশ্চিম ও মধ্য এশিয়া এবং উত্তর-ভারত থেকে বিভিন্ন সময়ে শত শত সুফি দরবেশ বাংলাদেশে আগমন করেন। তারা নানা তরীকার বিশেষ করে চিশতিয়া ও সোহরাওয়ার্দীয়া সম্প্রদায়ের অন্তর্ভূক্ত ছিলেন। বর্হিদেশ থেকে আমদানীকৃত হলেও, বাংলাদেশ সুফিবাদ বিস্তারের উপযুক্ত ক্ষেত্র হিসেবে প্রমাণিত হয়। সুফিবাদ সমগ্র বাংলাদেশ এমনকি সূদুর গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে, ফলে খানকাহ ও দরগাহ দেশের আনাচে কানাচে পর্যন্ত গড়ে উঠেছিল। বাংলার মাটিতে সুফিবাদ এত বেশি প্রসার লাভ করে যে, কয়েকজন বিখ্যাত বাঙ্গালী সুফির শিক্ষার ভিত্তিতে এখানে কয়েকটি নতুন মরমী সম্প্রদায়ের বিকাশ হয়।

বাংলায় সুফি আগমনকে ঐতিহানিকরা তিনটি পর্যায়ে ভাগ করেছেন। যেমন-
১. মুসলিম রাজশক্তি প্রতিষ্ঠার পূর্বে (৭ম – ৮ম শতকে) বণিকদের মাধ্যমে।
২. মিশনারী ভূমিকায় সুফি আগমন (এগারো শতক থেকে)।
৩. মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার পর থেকে (তের শতক থেকে)।

বাংলায় সুফি আগমন এবং তাঁদের কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে বাংলার মানুষের নিকট তাঁরা খুব সহজে জনপ্রিয় হয়ে উঠেন যার পিছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ পেক্ষাপট রয়েছে।

রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায় মধ্যযুগ হল বাংলার মুসলিম শাসনের ইতিহাস, বাংলায় ইসলামের আবির্ভাব, প্রতিষ্ঠা এবং দীর্ঘদিন টিকে থাকার কারণে ধীরে ধীরে বাংলার সমাজ সংস্কৃতি ও সভ্যতায় এক বিরাট পরিবর্তন আসে। মুসলমান সুফি, সাধক ও শাসক শ্রেণীর ঔদার্যে এদেশের সনাতন সাংস্কৃতিক চেতনায় মুসিলম ধ্যান-ধারণা জায়গা করে নেয়। ইসলাম ধর্মের প্রচারক হিসেবে সুফি দরবেশগণ তাদের উদার মানসিকতার কারণে এদেশের মানুষের মনে বিশেষ স্থান লাভ করেন।

প্রাচীনকাল থেকে বাংলায় আর্থ-সামাজিক ও সংস্কৃতির বিভিন্ন দিক বিচারে চতুবর্ণের (ব্রাক্ষণ, কায়স্থ, বৈশ্য, শুদ্র) বিকাশ ঘটে, যার চূড়ান্ত ও নির্মম পরিণতি পরিলক্ষিত হয় সেন শাসনামলে, বল্লাল সেন কৌলিন্য প্রথা প্রবর্তন করায় সমাজে স্বীকৃতি ছিল না নিম্ন শ্রেণীর মানুষদের। সেই সাথে সামন্তবাদের প্রভাবে অর্থনৈকি অবস্থাও হীন থেকে হীনতর হয়ে উঠে। সাধারণ মানুষের চোখে প্রশাসন ছিল ভীতি এবং সামাজিক বৈষম্য ছিল অমানবিক অত্যাচারের মত। শুধুমাত্র সামাজিক বিধান আরোপের মাধ্যমে নয় বরং প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপের মাধ্যমে জনসাধারণের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছিল। এই বৈষম্যমূলক সমাজ বিধান ও হিংসাত্মক আচরণ অবহেলিত শ্রেণীকে বিক্ষুব্ধ করে তুলেছিল এবং লক্ষণ সেনের স্বৈরাচারী মনোভাব এর কারণে রাজসভার আমত্যরাও বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল। এই জ্ঞাতি বিদ্বেষ এবং সামাজিক বৈষম্য ও বিশৃঙ্খলা ইসলাম প্রচারের জন্য একটি উপযোগী ও অনুকূল পটভূমি প্রস্তুত করে।

ভারতবর্ষে ইসলাম প্রচারের দুটো পদ্ধতি ছিল।
(১) তুর্কিয়ানা তরীকা (২) সুফিয়ানা তরিকা।

বাংলায় ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে সুফিয়ানা তরিকা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, কেননা সুফিদের মানবিকতার আবেদন, ব্যক্তিত্ব ও অলৌকিক ক্ষমতায় সাধারণ মানুষের মধ্যে শ্রদ্ধা ও অনুরক্তির জন্ম হয়েছে। তাদের জীবন যাত্রার সরলতা ও সাম্যের বাণী তৎকালীন সাধারণ মানুষের বিশেষ করে ধর্মীয় ও সামাজচ্যুতদের ইসলামের সাম্যবাণী বয়ে আনা সুফিবাদ উৎসাহের কারন হয়ে উঠে

সুফিদের মতে, আত্মার পবিত্রতার মাধ্যমে ফানাফিল্লাহ (আল্লাহর সঙ্গে অবস্থান করা) এবং ফানাফিল্লাহর মাধ্যমে বাকাবিল্লাহ (আল্লাহর সঙ্গে স্থায়িভাবে বিলীন হয়ে যাওয়া) লাভ করা যায়। এই সাধনাকে ‘তরিকত’ বা আল্লাহ-প্রাপ্তির পথ বলা হয়। তরিকত সাধনায় আবার একজন মুর্শিদের প্রয়োজন হয়। সেই পথই হলো ফানাফিল্লাহ। ফানাফিল্লাহ হওয়ার পর বাকাবিল্লাহ লাভ হয়। বাকাবিল্লাহ অর্জিত হলে সুফি দর্শন অনুযায়ী সুফি আল্লাহ প্রদত্ত বিশেষ শক্তিতে শক্তিমান হন এবং অজস্র কারামত প্রদর্শনের অধিকারী হন ।
এই সুফিবাদ উৎকর্ষ লাভ করে পারস্যে। সেখানকার সুফি-দরবেশ এবং কবি-সাহিত্যিকগন তাদের বিভিন্ন কাব্য ও পুস্তক রচনা করে এই দর্শনকে সাধারণের নিকট জনপ্রিয় করে তোলেন। কালক্রমে ওলীদের অবলম্বন করে নানা তরিকা গড়ে ওঠে। সেগুলির মধ্যে চারটি প্রধান তরিকা সর্বাধিক প্রসিদ্ধি লাভ করে:
১) বড় পীর হযরত আব্দুল কাদির জিলানী প্রতিষ্ঠিত কাদেরিয়া তরিকা,
২) খাজা মু’ঈনুদ্দীন চিশতি প্রতিষ্ঠিত চিশতিয়া তরিকা,
৩) খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দী প্রতিষ্ঠিত নকশবন্দিয়া তরিকা এবং
৪) শেখ আহমদ মুজাদ্দিদ-ই-আলফে ছানী সারহিন্দী প্রতিষ্ঠিত মুজাদ্দিদিয়া তরিকা।
এছাড়া সুহ্‌রাওয়ার্দিয়া, মাদারীয়া, আহমদিয়া ও কলন্দরিয়া সহ আরও বেশ কয়েকটি তরিকার উদ্ভব ঘটে।
বাংলায় সুফিবাদঃ
বাংলায় সুফিবাদের আবির্ভাবকাল সঠিকভাবে বলা কঠিন। তবে একাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে সপ্তদশ শতাব্দী পর্যন্ত এদেশে সুফিবাদের সর্বাধিক প্রচার ও প্রসার হয়েছে বলে জানা যায়।আরব, ইয়েমেন, ইরাক, ইরান, মধ্য এশিয়া ও উত্তর ভারত থেকে সুফিরা এসে বঙ্গদেশে সুফিবাদ প্রচার করেন। তাদের মৃত্যুর পর কিছু অতিভক্তগন কর্তৃক প্রচলিত হয়ে যায় যে তারা বিভিন্ন অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন, লিখা হয় বিভিন্ন গাঁজাখুরি কিচ্ছা কাহিনি যা ইসলামের সাথে সরাসরি বিরোধ করে ও তারা নাকি আমাদের প্রিয় রাসুল (সাঃ) এবং সাহাবাদের (রাঃ) থেকেও বেশি অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন, এই সব কথা লিখা হয়েছে তাদের বই গুলোতে এবং তাতে স্পষ্ট শিরক ও কুফর লক্ষ্য করা যায়।
সুফিদের চালচলন, মানবপ্রেমের ইত্যাদির কারণে এদেশের সাধারণ কিছু মানুষ সুফিবাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ওঠে । এভাবে ক্রমশ বঙ্গদেশে সুফিবাদ প্রসার লাভ করে। ১২০৪-৫ খ্রিস্টাব্দে বখতিয়ার খলজী কর্তৃক বাংলাদেশ বিজিত হলে ইসলামের শরীআত ও মারিফত উভয় ধারার প্রচার ও প্রসার তীব্রতর হয়। শাসকশ্রেণীর সঙ্গে বহু পীর-দরবেশ এদেশে আগমন করে নিজস্ব তরীকায় ইসলাম প্রচারে মনোনিবেশ করেন। এরা নিজ রচিত সুফিবাদের আধ্যাত্মিক তত্ত্ব চমৎকারভাবে তুলে ধরে সাধারণ কিছু মূর্খ মানুষকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেন, ফলে বঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে এই মতবাদ প্রসার লাভ করে। সুফিগণ নিজেদের রচিত বিভিন্ন তরীকা এবং মানুষের মাঝে প্রেম-ভ্রাতৃত্ব-সাম্যের মধুর বাণী প্রচার করে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এদেশের কিছু সাধারণ মানুষের মন জয় করতে সক্ষম হন ।
তাদের মধ্যে কেউ কেউ লোকমুখে কিংবদন্তি-পুরুষে পরিণত হয়েছেন। এদের অনেকের মাযার তৈরি হয়েছে, যেগুলোকে পবিত্র ও পুণ্য স্থান বিবেচনা করা হয় । এমন কি কেউ কেউ নিয়মিত যিয়ারত করে ও পার্থিব কামনা-বাসনায় মানত করে, মাজারে টাকা পয়সা, ফুল , মোমবাতি , আগরবাতি ইত্যাদি দেয়াকে ছওয়াব মনে করে ! এই সুফিবাদ দ্বারা পরবর্তীতে বৈষ্ণবধর্ম, লৌকিক মরমিবাদ, বাউল ধর্মমত ও অন্যান্য ভক্তিবাদও কমবেশি প্রভাবিত হয়।
কিছু সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনেও সুফিদের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। যেমন নদী ও সমুদ্রপথে যাতায়াতের সময় কিছু মাঝিরা বদর পীরের নাম স্মরণ করে। শুধু তাই নয়, নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছানোর উদ্দেশ্যে শহরের কিছু যানবাহনে পর্যন্ত বিভিন্ন পীর-আউলিয়ার নাম লেখা থাকে। লৌকিক ধারার মুর্শিদি-মারফতি গান, গাজীর গান , গাজীকালু-চম্পাবতী কাব্য ও অন্যান্য মরমীসাহিত্য, মাদার পীর ও সোনা পীরের মাগনের গান ইত্যাদি বিভিন্ন পীর-দরবেশকে কেন্দ্র করে রচিত। এভাবে বাংলায় কিছু মানুষের ধর্মীয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও বৈষয়িক জীবনের নানা ক্ষেত্রে সুফিবাদের প্রভাব দেখা যায় । কিন্তু এই সুফিবাদের সাথে না আছে কোরআনের কোন সম্পর্ক, না আছে হযরত রাসুলে কারিম (স) এর ৬৩ বছরের জীবনযাত্রার সম্পর্ক, আর না আছে নবীর অনুসারীদের জীবনযাত্রার সম্পর্ক ।
পরিশেষে অল্প কিছু কথা :
মুলত একটি বিষয় আমাদের মনে রাখতে হবে, এই দেশে ইসলামের দাওয়াত প্রথমেই আল্লাহর কিতাব থেকে হইনি, হয়েছে সুফি দরবেশদের আমল-আখলাক, বেশ-ভুষা, সুন্দর ব্যাবহার, মাধুর্যমণ্ডিত কাব্য-কথা ইত্যাদির মাধ্যমে ।

তথ্যসূত্র/ সহায়ক গ্রন্থঃ
১. “A History of Sufism in Bangal”, Anamul Haque.
২. বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস, ড. এম. এ. রহিম।


তরিকা কি?

$
0
0

তরিকা শব্দটি আরবী তারিক শব্দ হইতে পরিগৃহীত হইয়াছে, ইহার বাংলা অর্থ হইল পথ, রাস্তা ইত্যাদি। কিন্তু অবশ্যই বুঝিতে হইবে যে, এই পথ কোন সাধারণ পথ নয় বরং মহান আল্লাহ্র নৈকট্য হাসিল করার নিমিত্তে যে পথ অতিক্রম করা হইয়া থাকে মূলত সেই পথকেই তরিকা বলা হইয়া থাকে। ইসলামী আধ্যাত্মিক পরিভাষায় তরিকা হইল বেলায়েতের জ্ঞান অর্জন করিতে আল্লাহর অলিগণের প্রবর্ত্তিত বিভিন্ন সাধন পদ্ধতি আর সে পথটির সিলসিলা হইতেছে নিম্নরূপ:
পবিত্র কোরআনের দিক নির্দেশনা এবং রাসূল সা. ও তাঁহার পবিত্র আহ্লে বাইত আ.-এর দিক নির্দেশনার আনুগত্য করাই হইতেছে- মহান আল্লাহ্র নৈকট্য হাসিল অর্থাৎ পরিপূর্ণতায় পৌঁছানোর পথ।
পবিত্র কোরআনে বলা হইয়াছে:
“লাকাদ কানা লাকুম ফি রাসুলিল্লাহ্ উসওয়াতুন হাসানাহ্…” ।
অর্থ: আল্লাহ্র রাসূলের মধ্যেই রহিয়াছে তোমাদের জন্য সকল সুন্দরের আদর্শ।
রাসূল সা. কর্তৃক মদিনা মোনওয়ারাহ্তে তৌহিদ বা এলাহিয়্যাতের শিক্ষা তথা মারেফাত অর্জনের যে শিক্ষাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল, তাহার পথ চলা শুরু হইয়াছিল পবিত্র কোরআন ও রাসূল সা.-কে আনুগত্যের মাধ্যমে।
হযরত আলী রা. যেহেতু রাসূল সা.-এর একনিষ্ঠ বিশ্বস্ত এবং গোপন ভেদের আমিন ছিলেন তাই তাঁহার পরে তিনিই দ্বিতীয় ব্যক্তি যিনি এই শিক্ষাকেন্দ্র পরিচালনার দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হন। তিনি স্বীয় জীবদ্দশায় বহু শিষ্য তৈরী করিয়াছিলেন এবং রাসূল সা.-এর পরে তাঁহার সকল শিষ্যই হযরত আলী রা.-এর শিষ্যে পরিণত হইয়াছিলেন।
হযরত  মুহাম্মদ  মুস্তাফা  সা.-কে  সূফীগণ প্রথম ও শ্রেষ্ঠ পীর বলিয়া অভিহিত করেন এবং আধ্যাত্মিক জ্ঞানের মূল উৎস বলিয়া মনে করেন। সেই জন্য হযরত রাসূলে করীম সা. হইতেই সমস্ত তরিকার উদ্ভব।
হযরত নবী করীম সা. তাঁহার বিশেষ কিছু সাহাবীকে মিনহাজ বা তাসাওউফ বা তত্ত্ব দর্শন শিক্ষা দান করিয়াছেন। তাঁহাদের উল্লেখ যোগ্য হইলেন- হযরত আবু বকর সিদ্দিক রা., হযরত ওমর ফারুক রা., হযরত আলী রা., হযরত সালমান ফারসী রা., হযরত আবু জর গিফারী রা., হযরত আবু হোরায়রা রা., হযরত আবু আইয়ুব আনসারী রা., হযরত মিকদাদ রা., হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসির রা., হযরত মাআ’জ রা. প্রমুখ।
হযরত আবু বকর রা.-এর মাধ্যমে বর্ত্তমানেও দুইটি তরিকার অস্তিত্ব পাওয়া যায়। এই তরিকা দুইটি হইল: নকশবন্দিয়া ও মুজাদ্দেদিয়া। হযরত ওমর রা.-এর মাধ্যমে প্রচারিত তরিকার বর্ত্তমানে কোন অস্তিত্ব নাই। হযরত সালমান ফারসী রা. ইয়ামেন অঞ্চলে তরিকত প্রচার করিতেন। নকশবন্দিয়া ও মোজাদ্দেদিয়া তরিকার শাজারা মোবারকেও তাঁহার নাম রহিয়াছে। হযরত আলী রা.-এর মাধ্যমে প্রচারিত তরিকার উপর ভিত্তি করিয়াই কাদেরিয়া ও চিশতিয়া তরিকা সহ বিভিন্ন তরিকা ও উপ-তরিকা বর্ত্তমানে বিদ্যমান রহিয়াছে। তাঁহার প্রচারিত তরিকা প্রধানতঃ তাঁহার পুত্রদ্বয় হযরত ইমাম হাসান রা. ও হযরত ইমাম হোসাইন রা. এবং বিশিষ্ট তাবেঈন হযরত হাসান বসরী রহ.-এর মাধ্যমে প্রচারিত হইয়াছে। অন্যদের মাধ্যমে প্রচারিত কোন তরিকার সন্ধান বর্ত্তমানে তেমন পাওয়া যায় না। অবশ্য বিশিষ্ট তাবেঈন হযরত ওয়াইস করনী রহ.-এর মাধ্যমে প্রচারিত ওয়াইসিয়া তরিকা বর্ত্তমানে বিদ্যমান রহিয়াছে।
বিভিন্ন তরিকার নিয়ম-কানুন, আধ্যাত্মিক সুলুক ও তালিম সু-সংগঠিত ও সু-সংবদ্ধ হয় খৃষ্টীয় দশম শতাব্দীর দিকে। ইহার পূর্ব্বে সূফীগণের আধ্যাত্মিক অনুশীলন মুখে মুখে চলিয়া আসিতেছিল। এই সময় (১০ম শতাব্দীতে) আধ্যাত্মিক সাধনার সু-বিখ্যাত কুতুব ও প্রৌজ্জ্বল পীর-মোর্শেদগণ বিভিন্ন তরিকা প্রতিষ্ঠা করেন। এই সকল সূফী-পীর স্বীয় তরিকার ইমাম ও কুতুব হিসাবে পরিগণিত।
কাল-কালান্তরে হযরত আবু বকর সিদ্দিক রা., হযরত আলী রা.ও হযরত ওয়াইস করনী রহ.-এর তরিকার উপর ভিত্তি করিয়াই উল্লেখ যোগ্য সূফী-সাধকগণের মাধ্যমে অনেক তরিকা প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে। তাঁহাদের সাধন পদ্ধতির পার্থক্যের কারণেই তরিকার সংখ্যা বৃদ্ধি পাইয়াছে। তরিকা সমূহের সংখ্যা নির্দিষ্ট করিয়া বলা দুষ্কর। কাহারো মতে, তিন সহস্র বা ততোধিক। এই সকল তরিকার মধ্যে বহু সংখ্যক তরিকা অবলুপ্ত হইয়া গিয়াছে। প্রায় চারশত তরিকার সন্ধান পাওয়া যায়।

কাদেরিয়া মাইজভান্ডারীয়া তরিকা (জানার আগ্রহ )

$
0
0

নবুয়ত ও নবীউন :

নবুয়ত নবা শব্দ হতে উৎপন্ন ন। যাহার অর্থ সংবাদ দান। নবীউন কর্তৃবাচক ইচম, ইহার অর্থ সংবাদক। খোদাতায়লার আদেশ-নিষেধ সর্ম্পকীত মধ্যস্থতায় নবুয়তকে শ্রেষ্ঠতর নৈকট্যপূর্ন মানবতা বলা যাইতে পারে। নবুয়ত একটি বিশেষ গুন। আল্লাহ যাহাকে পছন্দ করেন তাহাকেই দিয়া থাকেন। ইহা সাধনা করিয়া অর্জন করা যায় না।

নবী দুই প্রকারঃ

১. মুরসল : যাহার প্রতি কেতাব অবতীর্ন হইয়াছে।

২. গায়র মুরসল : যাহার প্রতি কেতাব অবতীর্ন হয় নাই এবং অগ্রবর্তী মুরসল নবীর অনুবর্তী

নবুয়ত দুই প্রকারঃ

১. নবুয়তে আম্মা : অর্থাৎ যাহা সার্বজনীন বিশ্বমানবতার প্রতি প্রেরিত।

২. নবুয়তে খাচ্ছা : যাহা কোন বিশেষ কওম বা জাতির প্রতি প্রেরিত।

বেলায়ত:

বেলায়ত অলা শব্দ হতে উৎপন্ন। অলা অর্থ নৈকট্য লাভ। ।প্রেম, মহব্বত সম্পর্ক। খোদাতায়লার নিকট-সম্পর্ককে বেলায়ত বলে।

 বেলায়ত দুই প্রকারঃ

১. বেলায়তে ঈমানঃ ইহা শুধুমাত্র খোদার সহিত সম্পর্ককে বুঝায়। এই বেলায়তে সমস্থ মোমেনগণ প্রপ্ত হইয়া থাকেন।

২. বেলায়তে এহছানঃ ইহা খোদার সহিত নিকটতম রহস্যপূর্ণ সম্পর্ক ও ক্ষমতাকে বলা হয়। শুধুমাত্র নবী ও অলীগনই ইহা প্রাপ্ত হয়।

 অর্জন প্রণালী ভেদে বেলায়ত চার প্রকারঃ

(১) বিল আছালতঃ- অর্থাৎ মূলগত বা প্রকৃতিগত। সূফীদের পরিভাষায় যাহাকে মাদরজাত বা জন্মগত বলা হয়। উহা বিনা রেয়জতে ও পরিশ্রমে খোদার নিকট হইতে নির্দ্ধারিতভাবে লাভ হইয়া থাকে এবং দওরায়ে ছামাবি বা আছমানী গর্দেশ ও প্রাকৃতিক আবর্তন বিবর্তনের সহিত সামঞ্জস্য রাখিয়া এই বেলায়ত নির্দ্ধারিতসময়ে প্রদত্ত হয়।

(২) বিল বেরাছতঃ- অর্থাৎ রূহানী উত্তরাধিকারী রূপে প্রাপ্ত হয়। যাহাকে ছুফী পরিভাষায় বিল অলায়ত বলা হয়।

(৩) বিদ দারাছতঃ- জাহেরী ও বাতেনী শিক্ষা দীক্ষা বা জ্ঞান অর্জনের যে এলমে লদুন্নী হাছেল হয়, তাহাকে বিদ্‌দারাছত বলে।

(৪) বিল মালামাতঃ- অর্থাৎ নফছ ও প্রবৃত্তির বিরূদ্ধাচরন করিয়া যে বেলায়ত হাছেল হয় , ছুফী পরিভাষা মতে হছুলে মোখালেফাত নফ্‌ছ বলা হয়। অর্থাৎ ইন্দ্রীয় প্রবৃত্তীর বিরূদ্ধে সংগ্রাম করিয়া উহাকে কষ্ট দিয়া নীজ আত্মার বশীভূত করিলে যে খোদায়ী শক্তি হাছেল হয় উহাকে বিল মালামাত বলে।

 স্তরের দিক দিয়া বেলায়ত তিন স্তরে বিভক্ত।

(১) বেলায়তে ছোগরাঃ- যাহারা বেলায়তী ক্ষমতা লাভে সধারন মোমেনের উর্দ্ধে স্থান পাইয়াছেন।

(২) বেলায়তে ওছতাঃ- যাহারা বেলায়তী ক্ষমতায় ফেরেস্তার উর্দ্ধে মধ্যম মর্যাদা লাভ করিয়াছেন।

(৩) বেলায়তে ওজমা বা কোবরাঃ- যাহারা বেলায়ত অর্জনে সর্বোচ্চ ক্ষমতা প্রাপ্ত হইয়াছেন। তাহারা সমস্ত সৃষ্ট জগতে ক্ষমতা ও প্রভাব বিস্তারে সক্ষম থাকেন। উক্ত বেলায়ত মর্যাদা প্রাপ্ত অলী কে বেলায়তে ওজমার অধিকারী বা শ্রেষ্ট অলী বলা হয়।

 এই বিবিধ স্তরের অলী উল্লাহ্‌দের মসরবকে কুতুবিয়ত (কর্ম কর্তৃত্ব) ও গাউছিয়ত (ত্রান কর্তৃত্ব ) নামে দুই ভাগে বিভক্ত করা হইয়াছে।

গাউছিয়ত- বা ত্রানকর্তৃত্বে সর্বোচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন অলীকে গাউছুল আজম বলা হয়। তিনি বিল আছালত বা প্রকৃতিগত ওজন্মগতভাবে অলী হন এবং আল্লাহ্‌তায়লার হুকুমে সৃষ্টির মঙ্গলময় ত্রানকর্তারূপে আবির্ভূত হন।

কুতুবিয়ত- বা কর্ম কর্তৃত্বে সর্বোচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন অলীকে কুতুবুল আকতাব বলা হয়। তিনি আল্লাহ্‌র হুকুমে সৃষ্টীর শৃঙ্খলা বিধানের সর্বময় কর্মকর্তারূপে বিরাজমান থকেন।

 ১৩ই

তাসাওউফ (সুফীবাদ বা সুফী দর্শন )সূফীবাদ একটি ইসলামি আধ্যাত্মিক দর্শন। আত্মা সম্পর্কিত আলোচনা এর মুখ্য বিষয়। আত্মার পরিশুদ্ধির মাধ্যমে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনই হলো এই দর্শনের মর্মকথা। পরম সত্তা মহান আল্লাহ কে জানার এবং আকাঙ্খা মানুষের চিরন্তন। স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্ককে আধ্যাতিক ধ্যান ও জ্ঞানের মাধ্যামে জানার প্রচেষ্টাকে সূফী দর্শন বা সূফীবাদ বলা হয়।হযরত ইমাম গাজ্জালী(রঃ)এর মতে, “আল্লাহর ব্যাতীত অপর মন্দ সবকিছু থেকে আত্মাকে প্রবিত্র করে সর্বদা আল্লাহর আরাধনায় নিমজ্জিত থাকা এবং সম্পূর্ন রূপে আল্লাহুতে নিমগ্ন হওয়ার নামই সূফী বাদ বলে। “‘সুফ অর্থ পশম আর তাসাওউফের অর্থ পশমী বস্ত্রে পরিধানের অভ্যাস (লাব্‌সু’স-সুফ) – অতঃপর মরমীতত্ত্বের সাধনায় কাহারও জীবনকে নিয়োজিত করার কাজকে বলা হয় তাসাওউফ। যিনি নিজেকে এইরূপ সাধনায় সমর্পিত করেন ইসলামের পরিভাষায় তিনি সুফি নামে অভিহিত হন। ইসলামি পরিভাষায় সুফিবাদকে তাসাওউফ বলা হয়, যার অর্থ আধ্যাত্মিক তত্ত্বজ্ঞান। তাসাওউফ বা সুফিবাদ বলতে অবিনশ্বর আত্মার পরিশুদ্ধির সাধনাকে বুঝায়। আত্মার পবিত্রতার মাধ্যমে ফানাফিল্লাহ (আল্লাহর সঙ্গে অবস্থান করা) এবং ফানাফিল্লাহর মাধ্যমে বাকাবিল্লাহ (আল্লাহর সঙ্গে স্থায়িভাবে বিলীন হয়ে যাওয়া) লাভ করা যায়। যেহেতু আল্লাহ নিরাকার, তাই তাঁর মধ্যে ফানা হওয়ার জন্য নিরাকার শক্তির প্রতি প্রেমই একমাত্র মাধ্যম। তাসাওউফ দর্শন অনুযায়ী এই সাধনাকে ‘তরিকত’ বা আল্লাহ-প্রাপ্তির পথ বলা হয়। তরিকত সাধনায় মুর্শিদ বা পথপ্রদর্শকের প্রয়োজন হয়। সেই পথ হলো ফানা ফিশ্‌শাইখ, ফানা ফিররাসুল ও ফানাফিল্লাহ। ফানাফিল্লাহ হওয়ার পর বাকাবিল্লাহ লাভ হয়। বাকাবিল্লাহ অর্জিত হলে সুফি দর্শন অনুযায়ী সুফি আল্লাহ প্রদত্ত বিশেষ শক্তিতে শক্তিমান হন। তখন সুফির অন্তরে সার্বক্ষণিক শান্তি ও আনন্দ বিরাজ করে।হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) স্বয়ং সুফিদর্শনের প্রবর্তক। তিনি বলেন, মানবদেহে একটি বিশেষ অঙ্গ আছে, যা সুস্থ থাকলে সমগ্র দেহ পরিশুদ্ধ থাকে, আর অসুস্থ থাকলে সমগ্র দেহ অপরিশুদ্ধ হয়ে যায়। জেনে রাখো এটি হলো কল্‌ব বা হৃদয়। আল্লাহর জিকর বা স্মরণে কল্‌ব কলুষমুক্ত হয়। সার্বক্ষণিক আল্লাহর স্মরণের মাধ্যমে কল্‌বকে কলুষমুক্ত করে আল্লাহর প্রেমার্জন সুফিবাদের উদ্দেশ্য। যাঁরা তাঁর প্রেমার্জন করেছেন, তাঁদের তরিকা বা পথ অনুসরণ করে ফানাফিল্লাহর মাধ্যমে বাকাবিল্লাহ অর্জন করাই হলো সুফিদর্শন। সুফিবাদ উৎকর্ষ লাভ করে পারস্যে। সেখানকার প্রখ্যাত সুফি-দরবেশ, কবি-সাহিত্যিক এবং দার্শনিকগণ নানা শাস্ত্র, কাব্য ও ব্যাখ্যা-পুস্তক রচনা করে এই দর্শনকে সাধারণের নিকট জনপ্রিয় করে তোলেন। কালক্রমে বিখ্যাত ওলীদের অবলম্বন করে নানা তরিকা গড়ে ওঠে। সেগুলির মধ্যে কয়েকটি প্রধান তরিকা সর্বাধিক প্রসিদ্ধি লাভ করে:

গাউছুল আজম বড় পীর হযরত আব্দুল কাদির জিলানী (রঃ) প্রতিষ্ঠিত কাদেরিয়া তরিকা,
সুলতানুল হিন্দ হযরত খাজা মু’ঈনুদ্দীন চিশতি (রঃ) প্রতিষ্ঠিত চিশতিয়া তরিকা,
গাউছুল আজম হযরত আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী প্রতিষ্ঠিত কাদেরিয়া মাইজভান্ডারীয়া তরিকা,
হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দী (রঃ) প্রতিষ্ঠিত নকশবন্দিয়া তরিকা এবং
হযরত শেখ আহমদ মুজাদ্দিদ-ই-আলফে ছানী সারহিন্দী (রঃ) প্রতিষ্ঠিত মুজাদ্দিদিয়া তরিকা।

তথ্যসুত্রঃ- উইকিপিডিয়া

ইসলামী সুফীতত্ত্ব: আত্মিক উৎকর্ষের পথ

$
0
0

সুফী:
১. সুফী শব্দটি (পশম) থেকে উদগত হয়েছে। কারণ, সুফীরা সাধারণ জীবন যাপনের জন্যে পশমী কাপড় পরিধান করতেন- । ড. রোনাল্ড এ নিকলসনের মতে পশমী পোষাক পরিচ্ছেদ পরিধানও আত্মার বিশুদ্ধতার জন্য জরুরী এবং সূফীরা তা পরতেন বিধায় তারা সুফী নামে পরিচিতি।
২. মোল্লা জামী বলেন, শব্দটি (পবিত্রতা ও স্বচ্ছতা) থেকে নির্গত হয়েছে। যেহেতু তারা পূতপবিত্র ও স্বচ্ছ জীবনযাপন করতেন –
৩. আবার কেউ কেউ বলেন, সুফী শব্দটি গ্রীক সাফিয়া শব্দ থেকে উদ্ভাবিত। সাফিয়া অর্থ জ্ঞান। সুফীরা আধ্যাত্মিক জ্ঞানের অধিকারী বলে এ নামে খ্যাত।
সুফীবাদের সংজ্ঞা:
মারূফ আল-কারখী বলেন, “সুফীবাদ ঐশী সত্তার উপলব্ধি।”
জুনায়েদ বাগদাদী বলেন, “জীবন, মৃত্যু ও অন্য সমস্ত ব্যাপারে আল্লাহর ওপর নির্ভরতাই সুফীবাদ।”
কারো কারো মতে,“ পরমত্মার সাথে জীবাত্মা মিল সাধন।”
আল কুরাইশী বলেন, “বাহ্য ও অন্তর্জীবনের পরিশুদ্ধিই হল সুফীবাদ।”
জাকারিয়া আনসারী বলেন, “চিরন্তন ও নিখুঁত আনন্দ লাভের জন্য ব্যক্তিসত্ত¡াকে শুদ্ধিকরণ, নৈতিক চরিত্রের উন্নতি বিধান এবং বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ জীবনকে সঠিকভাবে গড়ে তোলাই সুফীবাদ।”
সুফীবাদের স্তর পরিক্রমা :
১. শরীয়ত। ২. তরীকত। ৩. মা’রিফত। ৪. হাকিকত।
শরীয়ত:
ইসলামী জীবন ব্যবস্থার যাবতীয় বিধানকে শরীয়ত বলা হয়। সর্বপ্রথম শরীয়তের পূর্ণ অনুসারী হতে হয়। শরীয়তের যাবতীয় বিধানের মধ্য দিয়ে সুফী তার প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রিত করে প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে আত্মার অনুগত করেন। শরীয়তের পূর্ণ অনুসরণ ব্যতীত কেউ সুফী হতে পারবে না।
তরীকতের পরিচয় : সুফীদের পরিভাষায় তরীকত হচ্ছে; শরীয়তের যাবতীয় বিধান অনুশীলনের পর তাকে আধ্যাত্মিক গুরুর শরনাপন্ন হতে হবে। বিনা প্রশ্নে গুরুর আনুগত্য করতে হবে।
মা’রিফতের পরিচয় : সুফীদের পরিভাষায় মা’রিফত হচ্ছে, এমন একস্তর যার মধ্যে বান্দাহ উপনীত হলে সৃষ্টি রহস্য সম্পর্কে অবগতি অর্জন করতে পারে। এ স্তরে পৌঁছতে পারলে তার অন্তর আলোক উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। তখন তিনি বস্তুর নিকট তত্ত¡ উপলব্ধি করতে শুরু করেন। মানব জীবন ও সৃষ্টি জীবনের গুপ্ত রহস্য তার নিকট স্পষ্ট হয়ে ভেসে ওঠে।
হাকিকতের পরিচয় : আন্তরিকভাবে খোদার প্রেমের স্বাদ ও পরমাত্মার সাথে তার যোগাযোগ হয়। এটা হচ্ছে সুফী সাধনার চুড়ান্ত স্তর। এ স্তরে উন্নীত হলে সুফী ধ্যানের মাধ্যমে নিজস্ব অস্তিত্ব খোদার নিকট বিলীন করে দেন।
সুফীবাদের উৎপত্তি :
উৎপত্তি নিয়ে মতবেদ রয়েছে-
বেদান্ত ও বৌদ্ধ দর্শনের প্রভাব থেকে এর উৎপত্তি।
ঈসায়ী ও নিউপ্লেটনিক প্রভাব থেকে এর উৎপত্তি।
পারসিক প্রভাব হতে তার উৎপত্তি।
কুরআন ও সুন্নাহ থেকে এর উৎপত্তি।
বেদান্ত ও বৌদ্ধ দর্শনের প্রভাব থেকে এর উৎপত্তি : এইচ মোর্টন ও গোন্ড জীহার বলেন, মুসলমানদের সুফীবাদ ভারতীয় বেদান্ত ও বৌদ্ধ দর্শনের শিক্ষা হতে উদ্ভব হয়েছে। এমনকি বৌদ্ধদের “নির্বাণ” থেকেই মুসলমান এর আবিষ্কার করেছে। কিন্তু ভারতে আসার আগেও মুসলমানদের মাঝে সুফীবাদ প্রচলিত ছিল ।
ঈসায়ী বা নিউপ্লেটনিক প্রভাব থেকে এর উৎপত্তি : অধ্যাপক নিকলসন ও ভনক্রেমারের মতে ঈমারী বা খ্রিস্টাব্দে মরমীবাদের প্রভাব থেকে সুফীবাদের উদ্ভব হয়েছে। নবম শতাব্দীতে মুসলমানগণ সিরিয়া, মিসর, ফিলিস্তিন প্রভৃতি অঞ্চলে ইসলাম প্রচার করতে গিয়ে খ্রীষ্টীয়বাদের সংস্পর্শে আসে। তার প্রভাবেই মুসলমানদের মধ্যে সুফীবাদ জন্ম লাভ করে। তবে এটাও গ্রহণযোগ্য মত নয়। কারণ, ইসলামের প্রথম থেকেই সুফীতত্তে¡ও রেশ ছিলো। সত্যিকারর্থে পরবর্তী সময়ে এর দ্বারা কিছুটা প্রভাবিত হয়েছিলো।
পারসিক প্রভাব থেকে এর উৎপত্তি : দার্শনিক ব্রাউন ও তার অনুসারীদের মতে সুফীবাদ পারসকি প্রভাব থেকে উদগত হয়েছে। মুসলমানদের হাতে পারস্য সামাজ্যের পতনের পর পারসিকরা বিশ্ববিরাগ ও ধর্মীয় রহস্যবাদ গ্রহণ করে। এ মতবাদও সঠিক নয়।
কুরআন ও সুন্নাহ থেকে এর উৎপত্তি : ইসলামী সুফীবাদ পবিত্র কুরআন ও হাদীস থেকে উদ্ভব হয়েছে। কুরআন ও হাদীসের প্রত্যক্ষ সমর্থন থাকায় সুফীবাদের প্রকাশ রাসূল সা. সাহাবী, আহলুসসুফফা ও তাবেঈগণের মধ্যে হয়েছিল। অধ্যাপক পি,কে, হিট্টি বলেন, “কুরআনের আধ্যাত্মিক শিক্ষাই মুসলমানদের জাতীয় জীবনের বিভিন্ন অবস্থার প্রেক্ষাপটে সুফীবাদের মধ্যে দিয়েই আত্মপ্রকাশ করেছে।”
সুফীবাদের ক্রমবিকাশ :
১ রাসূলের যুগে সুফীবাদ : রাসূল সা.’র জীবদ্দশায় এর সূত্রপাত ঘটে। তিনি হেরা গুহায় আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন থাকতেন। একদল সাহাবী মসজিদে নববীর এক পার্শ্বে উপাসনা ও আল্লাহর ধ্যানে নিমগ্ন থাকতেন ।
২. খোলাফায়ে রাশেদার যুগে : খলীফাগণ বিরাট সাম্রাজ্যের মালিক হয়েও পার্থিব সুখ-শান্তি কামনা করতেন না তাঁরা আল্লাহর চিন্তায় ও ধ্যানে মগ্ন থাকতেন। তাদের অনুসরণ করে একদল সাহাবী ও তাবেঈ মোরাকাবা ও মোশাহাদায় সর্বদা লিপ্ত থাকতেন।
৩. উমাইয়া শাসনামলে সুফীবাদ : উমাইয়া শাসনামলে সুফীবাদের চরম উৎকর্ষ সাধন হয়। এ সময়ে কয়েকজন সুফী আল্লাহর ধ্যান-ধারণাকেই জীবনে চরম ও পরম ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেন। এ সকল ধর্মতাপদেশের মধ্যে ইমাম হাসান আল-বসরী, আবু হাশিম, জাবির ইবনে হাইয়ান, রাবেয়া বসরী, ইব্রাহিম ইবনে আদহাম, মারূফ আল-কারখী অন্যতম।
৪. আব্বাসীয় শাসনামলে সুফীবাদ : আব্বাসীয় শাসনামলে সুফী মতবাদ নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে পরিচালিত হতে থাকে এ যুগকে ইসলামের ইতিহাসে জ্ঞান-বিজ্ঞানের স্বর্ণযুগ বলা হয়। এ যুগে সুফী মতবাদের ওপর বিদেশী প্রভাব বিস্তার করতে থাকে। এক পর্যায়ে সুফীদের মধ্যে দু’টি দলের সৃষ্টি হয়।
ক. ইনকিশাফী দল : এদলে পুরোধা ছিলেন হযরত আবদুল কাদের জিলানী রহ., জুনায়েদ বাগদাদী রহ. প্রমুখ।
খ. ইসতিদলালী দল : এ দলের সুফীদের মধ্যে স্পেনের মহিউদ্দিন ইবনুল আরাবী ও রূমের মাওলানা জালালুদ্দীন রূমী রহ. অন্যতম।
৫. এ স্তরে ইমাম গাজ্জালীর খেদমত অপরিসীম। তিনি সুফীমতবাদের ওপর অনেকগুলো বই রচনা করেন। এসব রচনার মাধ্যমে তিনি সুফীমতবাদকে জনপ্রিয় করে তোলেন।
সুফীবাদের প্রথম উৎপত্তি আরবে পরে এটা ইরানে প্রসারিত হয় এবং ব্যাপক উৎকর্ষ সাধন করে। ওমর খৈয়াম, ফেরদৌসী, সাদী, জামী, প্রমুখ সুফী ইরানেই জন্মগ্রহণ করেন। অতঃপর এই সুফীমতবাদ ভারতবর্ষেও অনুপ্রবেশ করে। বর্তমানে প্রায় সকল দেশে তরীকাতের ইমামগণ সুফীমতবাদ প্রচার করে চলেছে। উপমহাদেশে এর খ্যাতি ও প্রসিদ্ধ আরবদেশগুলোর তুলনায় বেশি।
সুফীবাদের মূলনীতিসমূহ: সুফীবাদ এক প্রকার রহস্যময় হৃদয়ভিত্তিক ও আত্মোপলব্ধিমূলক মতবাদ। একে রুহানী প্রশিক্ষণও বলা হয়। ব্যক্তির আত্মার পরিশুদ্ধি ও পরম সত্তার সন্ধানই এর লক্ষ্য। এ লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য সুফীগণ কতগুলো মূলনীতি তৈরি করেছেন। নিম্নে সেগুলো তুলে ধরা হলোÑ
সুফীবাদের মূলনীতিসমূহ :
১. তাওবা : অন্যায় ও পাপের ওপর আন্তরিক অনুশোচনা, অন্যায়ের স্বীকৃতি ও ভবিষ্যতে এ কাজ না করার দীপ্ত শপথ। তাওবা হচ্ছে সুফী মতবাদের প্রথম মূলনীতি।
২. তাওয়াক্কুল : সর্বাবস্থায় দয়াময় আল্লাহ তায়ালার ওপর ভরসা করাই তাওয়াক্কুল।
৩. পরিবর্জন: এ প্রসঙ্গে নিজামুদ্দীন আওলীয়া বলেন, “স্বল্প আহার, স্বল্প কথন, স্বল্প মেলামেশা, স্বল্প নিদ্রার মধ্যেই নিহিত আছে মানুষের পূর্ণতা।”
৪. সবর : যে কোন অবস্থায় অস্থির না হয়ে আল্লাহর সিদ্ধান্তকে মাথা পেতে মেনে নেয়াই সবরের একমাত্র দাবী।
৫. আত্মসমর্পণ : গুরুও কাছে নিজ আত্মাকে সোপর্দ করে দিতে হবে।
৬. ইখলাস : নিছক আল্লাহ তা’য়ালার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে সব কাজ করতে হবে।
৭. আল্লাহর প্রেম : অন্তরে পার্থিব জগতের কোনকিছুর প্রেম ও মোহ থাকতে পারে না। সর্বক্ষণ আল্লাহকে পাওয়ার চিন্তায় মগ্ন থাকতে হবে।
৮. আল্লাহর যিকর : আধ্যাত্মিক উন্নতি সাধন ও অন্তরকে পরিশুদ্ধি করার জন্য সর্বদা আল্লাহর যিকর । এ প্রসঙ্গে
৯: শুকুর : আল্লাহর অফুরন্ত নেয়ামতের স্বীকৃতি প্রদান ও আনুগত্যকরণ শুকর বলা হয়।
১০. কাশফ : সুফীগণ যখন আধ্যাত্মিক সাধনার চরম পর্যায়ে উপনীত হন তখন তার অন্তদৃষ্টি খুলে যায় এবং তার সামনে গোপনীয় সকল রহস্যদ্বার খুলে যায়। এক পর্যায়ে তিনি আল্লাহর অসীমতার মাঝে নিজেকে হারিয়ে ফেলেন।
১১. ফানা ও বাকা : ফানা ফিল্লাহ এবং বাকাবিল্লাহ হচ্ছে সুফী সাধনার সর্বোচ্চ স্তর। এ স্তরে পৌঁছলে সুফী নিজের ব্যক্তিগত চেতনাকে মুছে দিয়ে ঐশী চেতনায় উন্নীত হন। ব্যক্তিগত চৈতন্য খোদার ধ্যান ও প্রেমে সমাহিত হয়। তাই আত্মচেতনার অবলুপ্তিকেই বলা হয় ফানা।
ফানার শেষ পর্যায়ে শুরু হয় বাকার প্রাথমিক পর্যায়। এ স্তরে সুফী সাধক আল্লাহর চিরন্তন সত্তার অবস্থান করেন।

সুফীবাদের বিভিন্ন তরীকাসমূহের বিবরণ:
খৃষ্টীয় দশম শতাব্দীতে আধ্যাত্মিক সাধনার পদ্ধতি নিয়ে সুফীদের মাঝে মতানৈক্য দেখা দেয়। যার কারণে তারা বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে পড়ে। তবে প্রত্যেক দলই হযরত মুহাম্মদ সা. কে প্রথম ও শ্রেষ্ঠ বলে অভিহিত করে এবং আধ্যাত্মিক জ্ঞানের উৎস বলে স্বীকার করে। নিম্নে সুফীবাদের তরীকাসমূহ আলোচনা করা হলোÑ
সুফীবাদের তরীকাসমূহ :
১. কাদেরীয়া তরীকা।
২. নকশবন্দীয়া তরীকা।
৩. চিশতিয়া তরীকা।
৪. মুজাদ্দেদীয়া তরীকা।
৫. .মাইজভান্ডার তরীকা.

আধ্যাত্মিক বা অতীন্দ্রিক দর্শন

$
0
0

ভূমিকা। ব্যক্তি-মানুষের জীবনে পাঁচ ইন্দ্রিয় শক্তির (দৃষ্টি, শ্রবণ, ঘ্রাণ, স্বাদ ও স্পর্শ) বাইরেও কিছু কিছু ঘটনা ঘটে থাকে। স্বাভাবিক বুদ্ধি বা কার্য-কারণ তত্ত্ব দিয়ে তার বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। কিন্তু মানব জীবনে এরকম বহু ঘটনা ঘটে। যেমন: একজন স্বপ্নে দেখেছেন, তিনি মরা মানুষ জীবিত করতে পারেন; কেউ কেউ রাতের অন্ধকারে গায়েবি আওয়াজ শুনতে পান; কারো কারো নজর লাগে বা মুখ লাগে যার ফলে অন্যের ক্ষতি হয়; কেউ কেউ ভবিষ্যতে কোথায় কি ঘটবে তার পূর্বাভাস পান, ইত্যাদি। এরূপ ঘটনা পাঁচ ইন্দ্রিয় ক্ষমতার বাইরে। তাই এসবের নাম অতীন্দ্রিক বা আধ্যাত্মিক ঘটনা।

বিভিন্ন ধর্মে  আধ্যাত্মিক  বা অতীন্দ্রিক ঘটনা ও ক্ষমতার বহু নজির পাওয়া যায়। যেমন: হজরত ইবরাহিম(আ.)এর নমরুদের বিশাল অগ্নিকুন্ড থেকে রক্ষা পাওয়া এবং আল্লাহ কর্তৃক তাঁর সবচেয়ে প্রিয় বস্তু (পুত্র) কুরবানি করার নির্দেশ, হজরত মূসার (ক.) সঙ্গে আল্লাহর সাক্ষাৎ বা তাঁর দলবলসহ হেঁটে নীলনদ পার হওয়া,  হজরত ঈসা (আ.)-এর উম্মতের জন্য খাদ্যসজ্জিত টেবিল আকাশ থেকে নামিয়ে দেয়া, আল্লাহর ওহী জিবরাঈলের (আ.) মাধ্যমে হজরত মোহম্মদের (স.) এর কাছে নাজেল হওয়া এবং তাঁর মে’রাজ গমন, হজরত সুলাইমান (আ.)-এর নির্দেশে বিশেষ ফিতারের জ্ঞানী এক ব্যাক্তিত্ব রাষ্ট্রের রানী বিলকিসের সিংহাসনকে চোখের পলকে ইয়ামন থেকে উঠিয়ে আনা,  হজরত ইউনূসের (আ.) মাছের পেটে বেঁচে থাকা ইত্যাদি বহু দৃষ্টান্ত দেয়া যায়।

বিশ্বের বিভিন্ন সমাজে বহু উদাহরণ আছে যারা এসব আধ্যাত্মিক বা অতীন্দ্রিক চর্চা করে সফল হন। তারা সমাজে বিশেষ মর্যাদার অধিকারী হন।এই উপমহাদেশে সভ্যতার উষালগ্ন থেকে আধ্যাত্মিক বা অতীন্দ্রিক চর্চা হয়ে আসছে। সাধু-সন্ত-সন্যাসী, আউল-বাউল, পীর-ফকির, আউলিয়া-কুতুব-দরবেশ, মরমি-সুফি, ভিক্ষু-শ্রমণ, পুরুত-ঠাকুর, তান্ত্রিক-যোগী-পরমহংস প্রমুখ পদ-নাম এর সঙ্গে জড়িত। এঁরা অতীন্দ্রিক বা আধ্যাত্মিক কেরামতি প্রদর্শনের মাধ্যমে যুগে যুগে সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করেছেন, যার যার ধর্ম বা আদর্শিক মতবাদ প্রচারের কাজ করেছেন এবং ভক্তি-শ্রদ্ধা কুড়িয়েছেন।

আবার জাদুকর, ডাকিনী, গুণিন, ওঝা, বৈদ্য, বাজিকর প্রমুখ ঝাড়ফুঁক, জাদু টোনা, বান মারা, বশ করা, ভুত ছাড়ানো প্রভৃতি তেলেসমাতি দেখিয়ে লোকজনকে বশীভূত বা সম্মোহিত করে তাদের উদ্দেশ্য হাসিল করেন। আর যারা ব্যর্থ হন তারা উন্মাদ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য ও লাঞ্চনা-গঞ্জনার শিকার হন। বলা বাহুল্য, ধর্ম সম্বন্ধে আমাদের অজ্ঞতা, কুসংস্কার এবং গোঁড়ামিই তাদের মত ধোঁকাবাজদের সমাজে প্রতিষ্ঠিত হবার সুযোগ করে দেয়।

শাব্দিক অর্থ। আধ্যাত্মিক শব্দের আভিধানিক অর্থ ‘আত্ম থেকে জাত’ বা ‘আত্মা সম্বন্ধীয়’ বা ‘মানসিক বা ব্রহ্মবিষয়ক’। অধ্যাত্ম অর্থ জীবাত্মা/পরমাত্মা। অধ্যাত্মবাদ একটি দার্শনিক মতবাদ যার মর্মকথাÑ ‘পরমাত্মাই সবকিছুর মূল’ । বাংলা ভাষায় অধ্যাত্ম ও আধ্যাত্মিকতা বা অতীন্দ্রিক ক্ষমতার বহু সমার্থক শব্দ পাওয়া যায়, যেমন অধ্যাত্মবাদ/তত্ত্ব, আত্মদর্শন, আত্মজ্ঞান/বিদ্যা, সুফিবাদ, ব্রহ্মবাদ/বিদ্যা, দেহতত্ত্ব, অন্তদৃষ্টি/জ্ঞানদৃষ্টি, মারেফাত, মনোজ্ঞান, যোগজ্ঞান, চীবর, মরমিবাদ, অতীন্দ্রিয়বাদ, পরমাত্মা, চৈতন্যবাদ, মুরাকেবা, আলোকদৃষ্টি, অলৌকিকতত্ত্ব ইত্যাদি।

২। আধ্যাত্মিক বা অতীন্দ্রিক দর্শন (Mysticism)|

আধ্যাত্মিক বা অতীন্দ্রিক দর্শন-এর সমার্থক শব্দ অধ্যাত্মবাদ, আত্মিকবাদ, অতীন্দ্রিয়বাদ, মরমিবাদ, সুফিবাদ ইত্যাদি (Mysticism)। এই নিবন্ধে Mysticism (মিস্টিসিজম) এর বাংলা পরিভাষা হিসেবেই এই শব্দগুলো ব্যবহার করা হয়েছে। ‘মিস্টিসিজম’ এমন এক গূঢ় তত্ত্ব, যা স্রষ্টা সম্পকে প্রত্যক্ষ জ্ঞান অর্থাৎ সর্বত্রই বিরাজমান তাঁর অস্তিত্ব সম্পর্কে সম্যক উপলব্ধি দেয়। বিশ্বের প্রধান প্রধান ধর্ম ইসলাম, হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন, খ্রিষ্টান, ইহুদী প্রতিটিতে ‘মিস্টিসিজম’ চর্চা চলে আসছে। তার সাথে সংশ্লিষ্ট সব আদর্শ, নৈতিকতা, আচার-প্রথা, পুরাণ, উপকথা, জাদুটোনা ইত্যাদিও রয়েছে। এর প্রভাব বিশ্বের প্রচলিত সব ভাষার সাহিত্য, বিশেষ করে কবিতা ও গানে অতি উজ্জ্বল ও সুস্পষ্টভাবে বিদ্যমান।

যিনি মিস্টিসিজম চর্চা করেন তাকে বলা হয় মিস্টিক। এর ব্যবহারিক বাংলা অর্থ মরমি সাধক বা মরমিয়া, সুফি, মুর্শিদ, দরবেশ, সাধু, সন্ন্যাসী, তান্ত্রিক, গুরু ইত্যাদি। ইংরেজি Mysticism এসেছে গ্রিক শব্দ mystes থেকে যার অর্থ চোখ বন্ধ করা। মরমি সাধকেরা চোখ বন্ধ করে অন্তর্দৃষ্টি ও গভীর চিন্তা-তন্ময়তার মাধ্যমে সত্য ও সুন্দরকে উপলব্ধি করার প্রয়াস পান। এই প্রয়াসে মনীষা ও ভাবাবেগের এক প্রকার সংমিশ্রণ ঘটে। এই মিশ্রণের বিচিত্র অনুভূতির প্রকাশ রূপক ও উপমা ছাড়া সম্ভব নয়। সুফিবাদেরও মর্মকথা: ‘হৃদয়ে তোমার চলে যেন আলিফের (আল্লাহ) খেলা। পবিত্র দৃষ্টি দিয়ে যদি তুমি জীবনকে দেখতে শেখো, তুমি জানবে আল্লাহর নামই যথেষ্ট। আল্লাহ প্রেমময় ও সৌন্দর্যময়। তিনি অনন্ত, অবিনশ্বর ও সর্বত্র বিরাজমান। প্রেম ও ভক্তির পথে আধ্যাত্মিক সাধনার মাধ্যমেই তাঁকে পাওয়া যায়। আল্লাহতে অনুগত বা লীন হওয়া সুফি সাধকের চরম লক্ষ্য।’

আধ্যাত্মিক সাধনা বা অধ্যাত্মবাদ অর্থ ব্রহ্ম বা পরমাত্মাই সবকিছুর মূল, এই দার্শনিক মত; আমাদের যাবতীয় জ্ঞানই জ্ঞাতার আত্মগত, এই মত। সংজ্ঞা হিসেবে বলা যায়, অধ্যাত্মবাদ এমন এক দর্শন, যেখানে আত্মার অবস্থা সম্পর্কিত আলোচনাই মুখ্য বিষয়। আত্মার পরিশুদ্ধির মাধ্যমে স্রষ্ঠা/আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনই হলো এই দর্শনের মূলকথা। পরমসত্তা বা আল্লাহকে জানার ও চেনার আকাঙ্খা মানুষের চিরন্তন। স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্ককে আধ্যাত্মিক ধ্যান ও কোরআন-হাদিসের জ্ঞানের মাধ্যমে জানার প্রচেষ্টা হলো অধ্যাত্মবাদ বা আধ্যাত্মিকতা বা অতীন্দ্রিক দর্শন।

ধর্ম, অধ্যাত্মবাদ ও আধ্যাত্মিকতাকে যদি একটা পিরামিড ভাবা হয় তবে ধর্ম হল নিম্নতম স্থান, অধ্যাত্মবাদের স্থান এর উপরে এবং পিরামিডের চূড়ায় থাকছে আধ্যাত্মিকতা।

প্রথম ধাপে আছে ধর্ম- যেমন ইসলাম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রীষ্টান ধর্ম প্রমুখ। অর্থাৎ, যেটা মানুষের তৈরী ঈশ্বরের কাছে যাবার জন্যে আপন দেশ কাল গন্ডীর সীমায় আবদ্ধ থাকে। তাই বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন ধর্মে একেক রকম ভাবনা- কেউ ভগবান, কেউ ঈশ্বর, কেউ ডাকেন আল্লাহ। সব মানুষদের তৈরী। ঈশ্বরের কাছে যাওয়ার জন্যে পথের শুরু বলা যায়।

ধর্মের গভীরে যদি যাওয়া যায় তবে দেখা যাবে তার যে আসল ভাব সেটি হল অধ্যাত্মবাদ। অর্থাৎ, ঈশ্বরকে ভালোবেসে তার কাছে পৌঁছানোর জন্যে যে বিভিন্ন জ্ঞান, যোগ বা ভক্তির পথ তা এখান থেকে শুরু। এখানে অধ্যাত্মবাদে কোনো ধর্মের সংকীর্ণতার মধ্যে মানুষ আবদ্ধ হয়না। যারা ধর্মের দেশ কাল পাত্রের গন্ডীর উপরে উঠতে পেরেছেন তারাই এই অধ্যাত্মবাদ নিয়ে ভাবনাচিন্তা করেন আর কিভাবে সেই অধ্যাত্মবাদকে আয়ত্ত করা যায় সেজন্যে চেষ্টা শুরু করেন।

আর অধ্যাত্মবাদ নিয়ে ভাবনাচিন্তা করতে করতে যারা নির্দিষ্ট উপায়ে সে পথে এগোতে শুরু করেন তাদের মধ্যেই জাগে আধ্যাত্মিক চেতনা। তারাই হলেন যথার্থ আধ্যাত্মিক পথের পথিক। সব মিলিয়ে বলতে গেলে, আধ্যাত্মিক হওয়াই আসল। কারণ সকল ধর্মের মূল নির্যাস হলো আধ্যাত্মিক চেতনা। তাইতো আধ্যাত্মিক পথের গভীরে গিয়ে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছেন ‘যত মত তত পথ’। আধ্যাত্মিক চেতনা জাগ্রত হলে এই উপলব্ধিই আসে।

আবার চারু শিল্পী শহিদ কবির বলেন,‘অধ্যাত্মবাদ হচ্ছে রূঢ় বাস্তবতা থেকে পালিয়ে বেড়ানো। মনে হলো, অধ্যাত্মবাদের ওপর আমার বিশ্বাস বাস্তবতা থেকে আমাকে দূরে ঠেলে দিয়েছে। স্পর্শ না করা পর্যন্ত কোনো কিছুতেই বিশ্বাস নয় এমন ধারণা আস্তে আস্তে পেয়ে বসে।’

আধ্যাত্মিক মনোবিদ্যা ( Parapsychology)

কিভাবে শুরু হলো ?

আধ্যাত্মিক কর্মকান্ড নিয়ে আমাদের দেশে কোন যৌক্তিক বা বৈজ্ঞানিক গবেষণার চেষ্টা হয়েছে বলে জানা নেই।

উনিশ শতকের শেষ দিক থেকে পশ্চিমে বিষয়টি নিয়ে গবেষণা শুরু হয়বিশেষ করে জার্মানিতে। জার্মানিতে প্রথম মনোবৈজ্ঞানিক গবেষণাগার (Laboratory of Experimental Psychology) স্থাপনের পর মনোবিজ্ঞান যেমন বিজ্ঞানের মর্যাদা দ্রুত অর্জন করেতেমনি তার পাশাপাশি আধ্যাত্মিক মনোবিদ্যাও।

অতীন্দ্রিক বা আধ্যাত্মিক কর্মকান্ড ও অভিজ্ঞতা নিয়ে বিজ্ঞানের যে শাখা কাজ করে তারই নাম আধ্যাত্মিক বা অতীন্দ্রিয় বা ইন্দ্রিয়াতীত বা আধ্যাত্মিক মনোবিদ্যা (parapsychology)

Parapsychology শব্দটি দার্শনিক ম্যাক্স Dessoir ১৮৮৯ সালে বা তার কাছাকাছি সময়ে প্রথম ব্যবহার করেন। আমেরিকান মনোবিজ্ঞানী ও দার্শনিক উইলিয়াম জেমস (১৮৪২১৯১০প্রথম আধ্যাত্মিক বিষয় নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। তখন বলা হতো মনস্তাত্ত্বিক বা আধ্যাত্মিক গবেষণা (psychical research)

১৯৩০ এর দশকে এটিকে গুরুত্বপূর্ণ একাডেমিক বিষয় হিসেবে পরীক্ষামূলক পদ্ধতির (experimental methodology)দিকে সরানো হয় এবং আধ্যাত্মিক গবেষণার বদলে আধ্যাত্মিক মনোবিদ্যা শব্দটি ব্যবহার করা হয়। ১৯৩০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলিনার ডিউক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক জে.বিরাইন ও তাঁর স্ত্রী লুসিয়া রাইন মনস্তাত্বিক গবেষণাকে পরীক্ষামূলক গবেষণায় উন্নীত করার চেষ্টা করেন।

জে.বিরাইন বিভিন্ন আধ্যাত্মিক ক্ষমতাকে ব্যাখ্যা করার জন্য অতীন্দ্রিয় উপলব্ধিকে (extrasensory perception-esp)ব্যবহার করেন। অতীন্দ্রিয় উপলব্ধিকে অনেক সময় ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় নামেও অভিহিত করা হয়। অতীন্দ্র্রিয় উপলব্ধি বলতে বোঝায় মনের বিশেষ ক্ষমতার মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা। এক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবে শারীরিক কোন উপায়ে বা পাঁচ ইন্দ্রিয় শক্তি দিয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয় না। এই পরিভাষাটি (esp) সাধারণ উপায় ব্যতিরেকে বিশেষ উপায়ে তথ্য লাভকে নির্দেশ করে। যেমন– মনের দ্বারা অতীতকালের তথ্য লাভ।

১৯৪০ সালে জে.বি.রাইন ও জেজিপ্র্যাট ১৮৮২ থেকে হালনাগাদ অবধি কার্ডভিত্তিক অনুমান সংশ্লিষ্ট পরীক্ষাগুলো পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা করে একটি রচনা লেখেন। রচনাটির নাম Extra-Sensory Perception After Sixty Years (আধ্যাত্মিক/অতীন্দ্রিক উপলব্ধির ষাট বছর)। এটি বিজ্ঞান সম্মত প্রথম মেটাঅ্যানালাইসিস হিসেবে স্বীকৃত। এতে ৫০টি পরীক্ষার কথা উল্লেখ আছেতন্মধ্যে ৩৩টিতে রাইন ছাড়াও অন্যান্য গবেষক ও ডিউক ইউনিভার্সিটির অবদান রয়েছে। এই মেটাঅ্যানালাইসিস অনুসারে স্বাধীন পরীক্ষাগুলোর ৬১%ফলাফল আধ্যাত্মিক/অতীন্দ্রিক উপলব্ধির(ইএসপিসপক্ষে।

মানে কি?

গ্রিকভাষা থেকে আধ্যাত্মিক বা অতীন্দ্রিক মনোবিদ্যা Parapsychology টার্ম এর উৎপত্তি। এর বাংলা অর্থ- যে মনোবিদ্যা প্রচলিত/গোঁড়া বিজ্ঞান কর্তৃক বাদ দেয়া মানসিক ঘটনাবলী (psi phenomena) নিয়ে কাজ করে।জীববিজ্ঞানী Berthold P. Wiesner আবিস্কার করেছেন গ্রিক শব্দ psi (সাই)।গ্রিক বর্ণমালার ২৩তম অক্ষর psi (সাই)।এর অর্থ মন বা আত্মা। সাই বা মন বা আত্মা একটি অতীন্দ্রিক/আধ্যাত্মিক(extrasensory) উপলব্ধি/শক্তি।এই শক্তি দিয়ে কোন ব্যক্তি অন্য কোন ব্যক্তি বা বস্তুকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন।এই অতীন্দ্রিক বা আধ্যাত্মিক ঘটনাবলীর(psi phenomena) অভিজ্ঞতার ব্যাখ্যা প্রাকৃতিক বা জীব বিজ্ঞানে অস্বীকৃত। এ বিষয় নিয়েই কাজ করে Parapsychology (আধ্যাত্মিক মনোবিদ্যা)। মনোবিজ্ঞানী রবার্ট দাউলেস ব্রিটিশ জার্নাল অব সাইকলজিতে লেখা একটি প্রবন্ধে ১৯৪২ সনে এ বিষয়টি প্রথম প্রকাশ করেন। মনোবিজ্ঞান (Psychology) কাজ করে পাঁচ ইন্দ্রিয়-গ্রাহ্য আচরণ নিয়ে আর আধ্যাত্মিক মনোবিদ্যা (Parapsychology) কাজ করে পাঁচ ইন্দ্রিয়-বহির্ভূত আচরণ নিয়ে।

প্রকারভেদ

প্যারাসাইকোলজিক্যাল এসোসিয়েশন সাইকে (psi) দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করে- অতীন্দ্রিক উপলব্ধি (সাই-গামা)এবং মনো-সঞ্চালন শক্তি (সাই-কাপ্পা)।

অতীন্দ্রিক উপলব্ধি (extrasensory perception) হচ্ছে অন্যের অনুভূতি বোঝার ক্ষমতা। শিশুদের মধ্যে এটা প্রবলভাবে পরিলক্ষিত হয়। বয়স বাড়ার সাথে সাথে এই ক্ষমতাটি কমে যেতে থাকে। তবে কিছু মানুষের মাঝে বয়স বাড়লেও ক্ষমতাটি রয়ে যায়। আর এ কারণেই হয়তো এ জাতীয় মানুষদের মাঝে অন্যকে সাহায্য করার প্রবল প্রবণতা দেখা যায়।

মনো-সঞ্চালন শক্তি/ক্ষমতা (Psychokinesis/Telekinesis or Mind Over Matter) হচ্ছে কোন বস্তুকে মনের শক্তি দ্বারা নাড়ানো অথবা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা। বিখ্যাত ম্যাজিসিয়ান ইউরি গেলার (Uri Geller)এই শক্তির সাহায্যে চামচ বাঁকিয়ে ফেলতে পারেন যা ‘Geller-effect’ নামে খ্যাত। এই ক্ষমতা প্রায় সবাই পেতে চায়। এখানে ট্রিক হচ্ছে আপনি যেটা দেখছেন সেটাকে গভীর বিশ্বাসের সাথে ভিন্নভাবে দেখা। সিনেমায় এমনটি আমরা হরহামেশা দেখি।

পরীক্ষা-নীরিক্ষা পদ্ধতি।

আধুনিক প্যারাসাইকোলজি নিয়ে গবেষণা মূলত বিভিন্ন দেশে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কর্তৃক পরিচালিত ও বেসরকারি অনুদানের মাধ্যমে নির্বাহিত হয়। প্যারাসাইকোলজি গবেষণার বিষয় মূলধারার একাডেমিক জার্নালে/পত্রিকায় খুব কমই প্রকাশিত হয়। অল্প কয়েকটি আছেযেমন- Journal of Parapsychology, Journal of Near-Death Studies, Journal of Consciousness Studies, Journal of the Society for Psychical Research and Journal of Scientific Exploration|

আধ্যাত্মিক মনোবিদরা আধ্যাত্মিক ঘটনাবলীকে দৃশ্যমানভাবে পরীক্ষা করার জন্য বহু পদ্ধতি অবলম্বন করেন। এই পদ্ধতিগুলোর মধ্যে যেমন রয়েছে গুণগত বৈশিষ্ট্য পরিমাপক সনাতন মনোবৈজ্ঞানিক পদ্ধতি তেমনি পরিমাণগত পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা-নীরিক্ষা নির্ভর বিভিন্ন পদ্ধতি। এর মধ্যে Ganzfeld, Remote viewing, psychokinesis or random number generators, Direct mental interactions with living systems উল্লেখযোগ্য।

কি পাওয়া গেল?

এসব গবেষণা থেকে এটুকু সত্যতা জানা গেছে যে দূরে নিঃসঙ্গ থাকা কোন ব্যক্তির ওপর অন্য ব্যক্তি নিরবচ্ছিন্নভাবে বিশেষ মনোযোগ আরোপ করলেতা নিঃসঙ্গ ব্যক্তির স্নায়ুকে প্রভাবিত (চঞ্চল বা শান্ত) করে। তবেআধ্যাত্মিক মনোবিদ্যা নিয়ে গবেষণা শত বছরের বেশী সময় ধরে অব্যাহত থাকলেও আধ্যাত্মিক ক্ষমতার অকাট্য প্রমাণ আজও দেখানো যায়নি বলে সমালোচিত।

আধ্যাত্মিক মনোবিদ্যা

$
0
0

স্কো. লি. আহসান উল্লাহ (অব.)

আধ্যাত্মিক মনোবিদরা দাবি করেন যে অতীন্দ্রিক/আধ্যাত্মিক/অস্বাভাবিক ঘটনাবলীও বৈজ্ঞানিকভাবে অধ্যয়ন করা যায়। তারা দৃশ্যত বেশ কয়েক রকমের ঘটনা নিয়ে কাজ করেন। যেমন, মনালাপন (telepathy), অলোকদৃষ্টি (clairvoyance),পূর্বজ্ঞান / ভবিষ্যদ্বাণী(pre-cognition), অতীতজ্ঞান(post-cognition / retro-cognition), মুমূর্ষু অভিজ্ঞতা (near-death experience), পুনর্জন্ম অভিজ্ঞতা (Reincarnation experiences), ভৌতিক অভিজ্ঞতা (apparitionalexperiences) প্রভৃতি- এগুলোকে অতীন্দ্রিক উপলব্ধিও (extrasensory perception)  বলা হয়। এ ছাড়া রয়েছে মনো-সঞ্চালন শক্তি (Psychokinesis) সহ অগণিত অতিপ্রাকৃতিক (supernatural) এবং আধ্যাত্মিক ঘটনাবলী । দৃষ্টান্ত স্বরূপ কয়েকটি সংক্ষেপে আলোচনা করা হলোঃ

মনালাপন বা আধ্যাত্মিক যোগাযোগ (Telepathy) 

কোন ব্যক্তি তার পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের সাহায্য বা ছাড়া অন্য ব্যক্তির নিকট তথ্য বা ভাব স্থানান্তর করার প্রক্রিয়াকে বলা হয় মনালাপন বা অতীন্দ্রিক বা আধ্যাত্মিক যোগাযোগ। অর্থাৎ মনের সাহায্যে দূরের কারও সাথে যোগাযোগ করা। পরিচিত কেউ বিপদে পড়লে আপনি হয়ত টের পেয়ে যান কিংবা স্মরণ করলে আপনিও বুঝতে পারেন। ইংলিশ পরিভাষায় এর নাম telepathy (টেলিপ্যাথি)। শব্দটি এসেছে প্রাচীন গ্রিকভাষা থেকে।tele অর্থ দূর (distant) এবং patheia/pathos অর্থ অনুভূতি/বোধ (feeling), উপলব্ধি (perception), প্রবল অনুরাগ/আবেগ (passion), দুর্ভোগ (affliction), ইত্যাদি  অভিজ্ঞতা । তার মানে  ইন্দ্রিয়ের সাহায্য ছাড়া নিজের মনোভাব দূরে প্রেরণ করা এবং অন্যের থেকে  গ্রহণ করা।

মনোবিজ্ঞানে টেলিপ্যাথির বাংলা পরিভাষা ‘ইন্দ্রিয়াতীত যোগাযোগ’। অতীন্দ্রিয়’র সমার্থক শব্দ যেমন- আধ্যাত্মিক, অলৌকিক, দেহতত্ত্ব, ব্রহ্মজ্ঞান, অতিপ্রাকৃত ইত্যাদি বহু আছে।

পৃথিবীর সব দেশে সব সমাজে অতীন্দ্রিক যোগাযোগের ব্যাপারটি প্রাচীনকাল থেকে বিদ্যমান। আধুনিক গল্প, উপন্যাস, নাটক, সিনেমা ও বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীতে অতীন্দ্রিক যোগাযোগ একটি আকর্ষণীয় বিষয়। দেখা যায়, এসব গল্প কাহিনীর সুপার হিরো এবং সুপার ভিলেনরা এবং ভিন গ্রহের প্রাণিরা অতীন্দ্রিক ক্ষমতার অধিকারি।

বিষয়টি নিয়ে গবেষণা শুরু হয়ে পাশ্চাত্যে উনিশ শতকের শেষে। টেলিপ্যাথি উদ্ভাবন করেন ইতালীয় ক্লাসিক্যাল পন্ডিত ফ্রেডরিক মায়ারস ( ১৮৪৩ – ১৯০১)। তিনি প্রথম গবেষণা করার লক্ষ্যে ‘সোসাইটি ফর সাইকিক্যাল রিসার্চ’ প্রতিষ্ঠা করেন। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে গবেষণা শুরু হয় ১৯৮২ সনে। প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার তাৎপর্যময় অগ্রগতির এক পর্যায়ে বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব মানসিক ঘটনাবলীর দিকে নজর দেয়। অনুমান এই যে, প্রাণির মধ্যে চুম্বকধর্ম বা আকর্ষণ শক্তি রয়েছে, যার নাম সম্মোহন। এর উপর পরীক্ষণের মাধ্যমে কোন ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া যাবে।

এই অনুমান থেকে পদার্থ বিজ্ঞানীরা বৈদ্যুতিক চুম্বকত্বের পরিবেশে (ইলেক্ট্রো-ম্যাগনেটিকফিল্ড- ইএম) বৈদ্যুতিক চুম্বকত্বের (ইএম) পরীক্ষণের মাধ্যমে বৈজ্ঞানিকভাবে অতীন্দ্রিক বা আধ্যাত্মিক ঘটনাবলীর ব্যাখ্যা হয়তো দেয়া সম্ভব বলে আশা করেছিলেন। এই প্রেক্ষাপট থেকেই টেলিপ্যাথির সূত্রপাত। এনিয়ে তারা বহু গবেষণা করেছেন কিন্তু কোন ফল পাননি। তাই পদার্থ বিজ্ঞানীরা আধ্যাত্মিক ঘটনাবলীর সত্যতা সম্পর্কে সন্দিহান। বিজ্ঞান আজো এর রহস্য উদঘাটন করতে না পারলেও প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।

অতীন্দ্রিক যোগাযোগের সঙ্গে দুটি মনস্তাত্ত্বিক ধারণার মিল আছে। তার একটি মনের মধ্যে বিভ্রান্তির আশা-যাওয়া ((delusion of thought insertion/removal) এবং অন্যটি মনস্তাত্ত্বিক মিথোজীবিতা বা দুই ভিন্ন জীবের সামঞ্জস্যপূর্ণ সহ-অবস্থানের মাধ্যমে সামাজিক সম্পর্ক স্থাপন (psychological symbiosis) । এই মিল থাকার কারণে অতীন্দ্রিক ঘটনাবলী নিয়ে কোন কোন মনোবিদ মনস্তাত্ত্বিক গবেষণায় এগিয়ে আসেন।

চিকিৎসা মনোবিজ্ঞান অনুসারে মানব মনে বিভ্রান্তির আসা-যাওয়া বিশেষত সিজোফ্রেনিয়া বা অনুরূপ শক্ত মনোরোগ। এধরনের মনোরোগী অবাস্তব কল্পনা/চিন্তা করেন, অসংলগ্ন ভাষায় কথা বলেন এবং অস্বাভাবিক আচরণও করেন। মনোরোগী নিজে বিশ্বাস করেন, এসব চিন্তা তার নিজস্ব নয়, অন্য কোন ব্যক্তি-মানুষ বা ভুত-পেতিœ বা দুষ্ট জ্বীন বা শয়তান কিংবা শত্রুপক্ষের ষড়যন্ত্রকারী গোপন কোন দুষ্টলোকের যাদুটোনা তার উপর ভর করেছে। সে (অন্য কেউ) তার (মনোরোগী) মধ্যে ঢুকে এসব চিন্তা করে আবার বের করে নিয়ে যায় (thought insertion/removal)। সাধারণত এধরনের মানসিক রোগীকে এন্টি-সাইকটিক ঔষধ বা থেরাপি দিয়ে সুস্থ করা হয়।

কোন ব্যক্তির শৈশবের প্রথম দিকে নিজের মন মানসিকতা এবং বাবা-মায়ের সঙ্গে সম্পর্কের অভিজ্ঞতা একাকার হয়ে থাকে। অর্থাৎ শিশু একদিকে তার নিজের মনের অবস্থা এবং অন্যদিকে তার বাবা-মায়ের সঙ্গে সম্পর্কের অভিজ্ঞতার মধ্যে কোন পার্থক্য নির্ণয় করতে পারে না। শৈশবে মনের এ অবস্থাকে বলে মনস্তাত্ত্বিক মিথোজীবিতা। শিশুর মানসিক ক্রমবিকাশের সঙ্গে সঙ্গে এটা আর থাকে না। কিন্তু কোন ব্যক্তির পরিণত বয়সেও শৈশবের অবস্থার অন্তর্নিহিত মর্মার্থ খুঁজে বের করা যায়।

অনুমান করা হয় যে, বিভ্রান্তি বা মতিভ্রমের অভিজ্ঞতা অথবা মনস্তাত্ত্বিক মিথোজীবিতা মনোবিদদের মনালাপনের আবিষ্কারের প্রতি আকৃষ্ট করেছে। এ থেকেই মানুষের মনে বিশ্বাস জন্মেছে যে, আধ্যাত্মিকতার অস্তিত্ব আছে। বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণামূলক তথ্যাদি এই ধারণা দেয় যে বিকারগ্রস্থ অসামাজিক ও আত্মকেন্দ্রিক ব্যক্তিত্বের লোকেরা বিশেষভাবে আধ্যাত্মিকতার প্রতি বিশ্বাসী হন। মনোচিকিৎসক এবং চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানীরাও একই মত পোষণ করেন।

আধ্যাত্মিক মনোবিদ্যা টেলিপ্যাথিকে এক ধরনের অতীন্দ্রিক প্রত্যক্ষণ অথবা ব্যতিক্রমী পরিজ্ঞান (anomalous cognition) রূপে বিবেচনা করে। আধ্যাত্মিক মনোবিদদের মতে ব্যক্তি তার অতীন্দ্রিক বা আধ্যাত্মিক শক্তির  মাধ্যমে তথ্য বা ভাব স্থানান্তর করে। বিষয়টিকে তারা পূর্বজ্ঞান এবং অলোকদৃষ্টির শ্রেণিভূক্ত করেন। আধ্যাত্মিক যোগ্যতা পরখ করার জন্য তারা বিজ্ঞানসম্মত পরীক্ষা (এক্সপেরিমেন্ট) করেন। তন্মধ্যে দুটি সুপরিচিত পরীক্ষার নাম যথাক্রমে: জেনার কার্ড (Zener cards) এবং গ্যানজফেল্ড পরীক্ষা (Ganzfeld experiment)। কিন্তু কোন ইতিবাচক ফল পাননি।

মনালাপন/টেলিপ্যাথি তিন ধরনের

অতীন্দ্রিক বা আধ্যাত্মিক মনস্তত্ত্ব কাজ করে এমন তিন ধরনের মনালাপন/টেলিপ্যাথির সংক্ষিপ্ত বর্ণনা নিম্নে দেয়া হলো:

সুপ্ত যোগাযোগ সুপ্ত যোগাযোগে ব্যক্তি তার আধ্যাত্মিক শক্তির মাধ্যমে তথ্য স্থানান্তর করেন। তথ্য প্রেরণ এবং গ্রহণের মাঝখানে সময়ের ব্যবধান নিরীক্ষণ করা যায়। অতীতজ্ঞানপূর্বজ্ঞান এবং স্বতঃস্ফূর্তজ্ঞান লব্ধ অনুভূতি এ যোগাযোগের মাধ্যমে স্থানান্তর করা হয়। তার মানে মনালাপনের মাধ্যমে কোন ব্যক্তি তার মনের অতীতবর্তমান ও ভবিষ্যত অবস্থা আরেকজনের কাছে জানাতে পারেন।

আবেগ সংক্রান্ত যোগাযোগ – একে দূর নিয়ন্ত্রিত প্রভাব বা আবেগপ্রবণ স্থানান্তরও বলা হয়। এটি সুখদুঃখের অনুভূতিকে বিকল্প অবস্থায় স্থানান্তর করার প্রক্রিয়া।

অতিসচেতন যোগাযোগ– এ ধরণের আধ্যাত্মিক যোগাযোগে ব্যক্তি তার মনের সচেতনার গভীরতম স্তরে প্রবেশের চেষ্টা করেন। গোটা মানব প্রজাতি সম্পর্কে সার্বিক জ্ঞান আহরণের জন্য গভীর ও বিস্তৃত উভয় জ্ঞান জগতে প্রবেশাধিকার পাওয়ার জন্য ব্যক্তি এরূপ যোগাযোগের চেষ্টা করেন।

মনালাপন বা টেলিপ্যাথি বিজ্ঞানের নিয়মনীতি বিরুদ্ধ। আজো এর কোন বিজ্ঞানসম্মত কর্মসাধন পদ্ধতি ঠিক করা যায়নি। মহাশূণ্যের ভেতর দিয়ে এক ব্যক্তি সংকেত পাঠাবেন আর তা হাওয়ায় মিলিয়ে দূরে চলে যাবে অপর প্রান্তে আরেক ব্যক্তির কাছে যার কোন প্রমাণ পাওয়া যাবেনা এমন তত্ত্ব প্রাকৃতিক বা জীব বিজ্ঞানের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। আধ্যাত্মিক মনোবিদ্যার বাইরে মনালাপন বা টেলিপ্যাথিকে ছলনা/প্রতারণাআত্মবিভ্রম ও আত্মপ্রবঞ্চনার ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। ব্যক্তির চিন্তা ও ভাষার বিভ্রম ঘটার আরেক নামও মনালাপন। পিরিডিন (Phencyclidine) জাতীয় মাদক দ্রব্য সেবন করেও কৃত্রিমভাবে টেলিপ্যাথিক ক্ষমতা দেখানো যায়।

বিশ্বের সব দেশে সব ভাষার সাহিত্যে নাটক সিনেমায়টেলিভিশন শোতে রোমাঞ্চকর আনন্দানুভূতি সৃষ্টির কাজে মনালাপন (টেলিপ্যাথি)ব্যবহৃত হচ্ছে। এটি এক ধরনের বিনোদন বলে মনে করা হয়।

অলোকদৃষ্টি (clairvoyance)

শব্দটি ফরাসী ভাষা থেকে আগত।এর অর্থ স্বচ্ছ দৃষ্টিক্ষমতা। এটি এক ধরনের অতীন্দ্রিক উপলব্ধি। মানুষের জ্ঞান বা ইন্দ্রিয় ক্ষমতার বাইরের কোন মাধ্যমের সাহায্যে দূরের কোন ব্যক্তি, বস্তু, স্থান বা বাস্তব ঘটনা জানার যোগ্যতা। এই ক্ষমতা দিয়ে শুধু দেখা যায়। এটি তিন রকমের: অতীত-জ্ঞান,পূর্ব-জ্ঞান এবং সমসাময়িক ঘটনাবলী দেখা (যা স্বাভাবিক মানবিক ইন্দ্রিয় গ্রাহ্য শক্তির বাইরে)।যার এই ক্ষমতা আছে তাকে বলা হয় স্বচ্ছদ্রষ্টা বা ত্রিকালদর্শী ।

‘বৈদেশে বৈরাজ্যে যাগো পুত্র মারা যায়, পশু-পঙ্খি ন জানিতে আগে জানে মায়’- বাংলার এই লোকসংগীতের চরণটি অলোকদর্শনের এক উত্তম উদাহরণ। তবে এই স্বচ্ছ অনুভব ক্ষমতা অর্জিত হয় মানুষের পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের অনুরূপ অতীন্দ্রিক ক্ষমতা উপলব্ধির মাধ্যমে। বৌদ্ধিক ধ্যান বা সমাধি-চর্চায় এক উন্নততর স্তরের সচেতন প্রক্রিয়া হিসেবে এর স্বীকৃতি রয়েছে। চোখ দিয়ে যা দেখা যায়না তা দেখা, কান দিয়ে যা শোনা যায়না তা শোনা, নাক দিয়ে যে ঘ্রাণ পাওয়া যায় না সে ঘ্রাণ পাওয়া, জিহ্বা দিয়ে যে স্বাদ গ্রহণ করা যায় না সে স্বাদ অনুভব করা, স্বাভাবিক জ্ঞান চর্চা দিয়ে নয় অন্তর্লোকের জ্ঞান দিয়ে পাওয়ারই নাম আলোকদৃষ্টি ।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা আলোকদর্শনকে দৃষ্টিভ্রম/মতিভ্রম রোগের লক্ষণ বলে মনে করেন। আধ্যাত্মিক মনোবিদ্যায় একে অনুভূতির/অনুভবের এক অতীন্দ্রিক উপলব্ধি বলে মনে করা হয়। বিজ্ঞান এটাকে স্বীকার করেনা।

পূর্বজ্ঞান (Pre-cognition/Pre-monition) 

ভবিষ্যতে ঘটবে এমন ঘটনার পূর্বাভাস পাওয়াকে বলে পূর্বজ্ঞান। তার মানে ঘটনা ঘটার আগে ভবিষ্যতের কোন স্থান বা ঘটনা সম্পর্কিত তথ্য আগাম উপলব্ধি করা। ভবিষ্যত জানতে পারা বা দেখতে পাওয়া। যেমন কেউ কেউ দাবী করেন যে তার ভবিষ্যতে কি হবে সেটা তিনি টের পান বা তিনি স্বপ্নে দেখতে পান ভবিষ্যতে কি হতে যাচ্ছে বা মন থেকে সতর্কবার্তা পান। এই ব্যাপারটির এমনি আরও নানান রকম উদাহরণ আছে ।

অতীত জ্ঞান(post-cognition/retro-cognition) 

এটা হচ্ছে অতীত দেখতে পাওয়া। যেমন কোন এক পুরনো নির্জন ভাঙ্গা বাড়িতে গিয়ে কেউ অনুভব করতে পারেন এখানে কি ঘটেছিল। সেখানে কারা বাস করতেন, কেমন ছিলেন তাঁরা, কি ঘটেছিল তাঁদের ভাগ্যে ইত্যাদি। এই ক্ষমতার অধিকারীরা অতীত সম্মন্ধে অনেক কিছু জানতে পারেন ।

মুমূর্ষু অভিজ্ঞতা (neardeath experience) 

প্রায় যারা মারা যাওয়ার মতো বা মুমূর্ষু অবস্থা বা ক্লিনিক্যাল মৃত্যু  থেকে সেরে ওঠা কোন ব্যক্তির অভিজ্ঞতার বিবরণকে বলা হয় মুমূর্ষু অভিজ্ঞতা।এ অভিজ্ঞতার বিবরণ একেক জনের একেক রকম, যেমনঃ  দেহ থেকে প্রাণ বেরিয়ে যাওয়া; নিজের শরীর থেকে উপরে উঠে শূণ্যে ভেসে চলা এবং চারপাশের দৃশ্যাবলী অবলোকন করতে থাকা; ভালোবাসায় এবং শান্তিতে নিমজ্জিত হওয়া; একটি সুড়ঙ্গের সরুপথ বেয়ে উপরের দিকে চলে যাওয়া; ইতিপুর্বে মৃত আত্মীয়-স্বজন বা ঐশ্বরিক/ভৌতিক আকৃতি/চেহারার সঙ্গে সাক্ষাত হওয়া; অপ্রত্যাশিত আলোর সামনে পড়া বা আলো হয়ে যাওয়া; নিজের জীবনকে পুননিরীক্ষণের অভিজ্ঞতা; কোন কিছুর শেষ/প্রান্তে পৌঁছে যাওয়া;এবং স্বেচ্ছায় বা অনিচ্ছায় নিজের দেহে ফিরে আসার অনুভূতি ইত্যাদি।

পুনর্জন্ম অভিজ্ঞতা (Reincarnation experiences) 

মৃত্যুর পর আবার জন্ম নিয়ে নতুন শরীরের মধ্যে  পূর্বজন্মের  মানবিক চেতনা বা আত্মার স্মৃতি প্রকাশ করতে পারার নাম পুনর্জন্ম অভিজ্ঞতা । এ সম্পর্কিত তথ্য নিয়ে ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোচিকিৎসাবিদ আয়ান স্টিভসন্স প্রায় ৪০ বছর ধরে ২৫০০ কেস স্টাডি করেন এবং এগুলো নিয়ে ১২টি বই লেখেন। তিনি দেখতে পান যে পুনর্জন্মের সাথে বাহ্যত শৈশবের স্মৃতি জড়িত/সম্পৃক্ত। সাধারণত তিন থেকে সাত বছরের শিশুরা আগের জন্মের স্মৃতি মনে করতে পারে। তারপর বয়স হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা স্মৃতি থেকে মুছে যায়। এ নিয়ে বহু গবেষণা হয়েছে কিন্তু বিজ্ঞানীরা এর পক্ষে কোন প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি।

ভৌতিক অভিজ্ঞতা (apparitional experiences) 

কোন মৃত ব্যক্তির আত্মা তার বেঁচে থাকা কালীন পুরনো জায়গায় বারবার ফিরে আসে বলে মনে করা, বা মৃত ব্যক্তি বেঁচে থাকা কালে ব্যবহৃত জিনিসপত্রের সম্মুখীন হওয়াকে বলে ভৌতিক অভিজ্ঞতা।এটি দৃশ্যত কোন জীব বা অশরীরী কিছু বিনা প্ররোচণায় সামনে এসে হাজির হতে দেখা। ব্যক্তি জেগে থেকে বা ঘুমেও এমন স্বাপ্নিক দৃশ্য দেখতে পায়।এটি একটি এলোমেলো, বিশৃঙ্খল, ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতা বা উপলব্ধি।একে জ্বিন-ভুত-প্রেত আরোপিত ঘটনাও বলা হয়।

বিজ্ঞান একে প্রেতাত্মা বলতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। কারণ, মানুষ মৃত্যুর পরেও কিছু স্মৃতি রেখে যায়, যা অন্যের কাছে বাস্তব বা মুর্তি রূপে ধরা পড়তে পারে। দ্বিতীয়ত, ভূতের গল্পের/কাহিনীর ভূত আর সত্যিকার ভৌতিক অভিজ্ঞতা প্রাপ্তদের ভূত এক নয়। ভৌতিক অভিজ্ঞতার ভূত/প্রেতাত্মা জীবজগতের মানুষ বা অন্যকোন প্রাণী কিংবা অপ্রাণীবাচক কোন বস্তু। গল্পের ভূতের মতো একেবারে কাল্পনিক কোন মুর্তি নয়।

এক গবেষণায়, বাস্তব জীবনে ভৌতিক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন এরকম ১৮০০ ব্যক্তির প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার বিবরণ থেকে জানা যায় যে, গতানুগতিক ভূত-প্রেতের গল্পের চেয়ে প্রেতাত্মা দেখার বাস্তব অভিজ্ঞতা পুরোপুরি আলাদা। বাস্তবে ভৌতিক অভিজ্ঞতা সবসময় ভীতিকর নয়। বরং বিভিন্ন মানসিক চাপ কিংবা সংকটে পড়েই মানুষ প্রেতাত্মা দেখলেও তা মানসিক চাপ কমাতে বা সংকটে শান্ত থাকতে সাহায্য করে। ব্যক্তি প্রেতাত্মা দেখতে পায় নিজের বাড়িতে বা কর্মস্থলে কর্মরত অবস্থায় এবং স্নায়বিক দূর্বল অবস্থার কারণে। কেউ ভূত দেখার ইচ্ছা করলেই ভূত দেখা যায় না। ভূত দেখে ছায়ামূর্তিরূপে কিন্তু পরিষ্কারভাবে নয়। ব্যক্তির দৃষ্টিভ্রম অবস্থার মান অনুযায়ী প্রেতাত্মার মূর্তিরূপ দেখতে পায়। অনেক সময় অভিজ্ঞতার পর তার অন্তর্দৃষ্টিতে ভেসে উঠে। ভূত-দ্রষ্টার সাথে দেখা ভূতের কোন কথা-বার্তা হয় না । শুধুই দেখে। ভৌতিক অভিজ্ঞতাটা কেবল ঐক্ষিক/দৃষ্টি নির্ভর।

ভৌতিক অভিজ্ঞতাটা মূলত দু’একটি দৃষ্টিবিভ্রম(visual illusion/hallucination)।মানসিকভাবে সুস্থ বা অসুস্থ যে কেউ তার অন্তর্নিহিত  মানসিক অবস্থার কারণে এমন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে পারে।

একই সময় দুই জায়গায় দেখা দেয়ার ক্ষমতা (Bilocation) 

কোন ব্যক্তির একই সময় দুই বা ততোধিক ভিন্ন ভিন্ন স্থানে শারীরিক ভাবে উপস্থিত হওয়া বা দেখা দেওয়ার আধ্যাত্মিক ক্ষমতাকে বাইলোকেসন বা মাল্টিলোকেসন বলে। বলা হয়ে থাকে আউলিয়া, দরবেশ,পীর-ফকির, মুনি ঋষি প্রমুখ এ ধরনের ক্ষমতার অধিকারী হন। এ তত্ত্বটি গ্রিক দর্শন, পুরোহিত-চিকিৎসাতত্ত্ব (Shamanism) পৌত্তলিকতাবাদ (Paganism), লোকাচার বিদ্যা (Folklore), ব্রহ্মবিদ্যা/জ্যোতিষশাস্ত্র (Occultism), জাদুবিদ্যা, অতীন্দ্রিয়চর্চা, সিদ্ধিলাভ তত্ত্ব, বৌদ্ধতত্ত্ব, রহস্যবাদ এবং দিব্যজ্ঞানবাদ (Theosophy) ইত্যাদিতে দেখা যায়। কোন কোন ধার্মিক গুরু বা ব্যক্তি (সাধু-সন্ন্যাসী, পীর-পয়গম্বর, মুনি-ঋষি) একই সময় বিভিন্ন স্থানে দেখা দেন বা তাঁকে দেখা গেছে বলে দাবী করা হয়। এটি একটি উচ্চমার্গের ব্যক্তিকেন্দ্রিক (highly subjective) অভিজ্ঞতা। এর রহস্য এখনও বিজ্ঞান ও আধ্যাত্মিক মনস্তত্ত্ব উদ্ধার করতে সক্ষম হয়নি।

নক্ষত্রলোকে ভ্রমণ (Astral Projection /travel)

আধ্যাত্মিক ভাবে বিভিন্ন জায়গায় যেতে পারার ক্ষমতা, তবে শারীরীক ভাবে নয়। পুরো ব্যাপারটিই মানসিক। চীন সহ বিভিন্ন দেশে হাজার বছরের পুরনো একটি ধারণা। এ এক ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। কোন ব্যক্তি তার বর্তমান দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে, নক্ষত্র-ভ্রমণোপযোগী দেহ বা রূপ ধারণ করে ভিন্ন নক্ষত্রে গিয়ে ফিরে আসাকে বলে নক্ষত্রলোকে ভ্রমণ বা এ্যাস্ট্রাল প্রজেকসন/ ট্র্যাভেল। নক্ষত্রলোকটা আমাদের পৃথিবীর বাইরে ভিন্ন কোন প্রান্তর (Astral Plane)।

এই তত্ত্বটি বিশেষত ধর্মের সঙ্গে জড়িত। ধর্মগ্রন্থ বাইবেল ও কোরআন, প্রাচীন মিশরীয় ধর্মতত্ত্ব, চীনের তাওবাদ, ভারতে বাল্মিকির যোগবশিষ্ঠ মহারামায়ণ প্রভৃতি গ্রন্থে এ বিষয়ে উল্লেখ আছে।

হজরত মুহাম্মদ (স.)তাঁর মক্কী জীবনের শেষ দিকে, মতান্তরে হিজরতের তিন বছর আগে রজব মাসের ২৭ তারিখের রাতে জাগ্রত অবস্থায় সশরীরে বোরাক নামক বাহনযোগে মক্কা থেকে বায়তুল মুকাদ্দাস এবং সেখান থেকে রফরফ যোগে ঊর্ধ্বলোকে পরিভ্রমণের মাধ্যমে সৃষ্টির অনন্ত রহস্য অবলোকন এবং আল্লাহর সান্নিধ্য অর্জন করেন। এর পর বায়তুল মুকাদ্দাস ফিরে এসে সব নবী-রসূলের ইমাম হয়ে নামাজ আদায় করে মক্কায় ফিরে আসেন। নবীজির (স.) মক্কা থেকে বায়তুল মুকাদ্দাসের ভ্রমণকে ‘ইসরা’ এবং বায়তুল মোকাদ্দাস থেকে উর্ধ্বলোকে ভ্রমনকে ‘মেরাজ’ বলা হয়। আরবি শব্দ মেরাজ অর্থ ওপরে ওঠার সিঁড়ি বা সোপান। ইসরা সম্পর্কে কোরানের ১৭ নং সূরা ইসরার প্রথম আয়াতে এবং মেরাজ সম্পর্কে কোরআনের ৫৩ সংখ্যক সূরা আন নাজমের ৮ থেকে ১০ এবং ১৩ থেকে ১৮ নং আয়াতে উল্লেখ রয়েছে। এ ছাড়া বহু বিশুদ্ধ হাদিসেও ইসরা ও মেরাজের ঘটনা বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে। কোরআনে  এমন আরও বাস্তব ঘটনা বর্ণিত হয়েছে যেমন হজরত মুসা (আ.)-এর দলবলসহ হেঁটে নীলনদ পার হওয়ার ঘটনা (৭ম সূরা আরাফ), হজরত ইবরাহিম(আ.)এর নমরুদের বিশাল অগ্নিকুন্ড থেকে রক্ষা পাওয়া (২১ সূরা আম্বিয়া আয়াত ৬৮- ৬৯), হজরত ঈসা(আ.)-এর উম্মতের জন্য আকাশ থেকে গায়েবি খাদ্য মান্না ও সালওয়া নামিয়ে দেয়া(২ সূরা বাকারা ৫৭ আয়াত), হজরত ঈসা (আ.)-এর উম্মতের জন্য খাদ্যসজ্জিত টেবিল আকাশ থেকে নামিয়ে দেয়া (৫ সূরা মায়েদা ১১২-১৩ আয়াত), হজরত সুলাইমান (আ.)-এর নির্দেশে বিশেষ ফিতারের জ্ঞানী এক ব্যাক্তিত্ব রাষ্ট্রের রানী বিলকিসের সিংহাসনকে চোখের পলকে ইয়ামন থেকে উঠিয়ে আনা (২৭ সূরা নামল, আয়াত ৪০)। ভারতের গুরু পরমহংস যোগানন্দ নক্ষত্র ভ্রমণের মাধ্যমে স্বামী প্রণবানন্দের সঙ্গে সাক্ষাত করেছেন । ভগবান শ্রী রজণীশও অনুরূপ নক্ষত্রলোকে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা লাভ করেছেন বলে দাবী করেন। আত্মসম্বরণ ও আত্ম-শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবন-যাপনের মাধ্যমে যোগসাধনা করে এবং ধ্যানের মাধ্যমে নক্ষত্রলোকে ভ্রমণ করা সম্ভব বলে চীন-তিব্বতী আধ্যাত্মিক সিস্টেমে এবং বৌদ্ধ ধর্মে দাবী করা হয়।

প্রাকৃতিক বিজ্ঞান দাবী করে যে নক্ষত্র ভ্রমণ কোন বস্তুগত ঘটনা নয় কারণ এর কোন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। আধ্যাত্মিক মনোবিদ্যা এ নিয়ে গবেষণা করে কোন ইতিবাচক ফল পায়নি। মনোবিদরা দাবী করেন এটি অলীক বিশ্বাস (delusion), দৃষ্টিভ্রম/মতিভ্রম (hallucination) বা রঙিন স্বপ্ন। স্বপ্ন, মাদকাসক্তি এবং বিভিন্ন ধরনের ধ্যানমগ্নতার কারণে নক্ষত্রলোকে ভ্রমণের কাল্পনিক অভিজ্ঞতা হতে পারে বলে চিকিৎসা মনোবিদরা দাবী করেন।

মনোসঞ্চালন শক্তি (Psychokinesis) 

কোন ব্যক্তি তার মনের জোর বা মানসিক শক্তি দিয়ে অন্য কোন ব্যক্তি, বস্তু, স্থান বা সময়কে নাড়ানো বা প্রভাবিত করার যে ক্ষমতা বা শক্তি তারই নাম মনো-সঞ্চালন শক্তি। ইংরেজীতে Psychokinesis। শব্দটি গ্রিকভাষা থেকে নেয়া। গ্রিক শব্দ psyche মানে মন (mind), আত্মা (soul), তেজস্বিতা (spirit), হৃদয় (heart) ও শ্বাস-প্রশ্বাস বা দম (breath)এবং kinesis মানে গতি (motion), সঞ্চালন বা নাড়ানো (movement)। এক কথায় সাইকোকাইনেসিস-এর শব্দগত অর্থ মনো-সঞ্চালন শক্তি (mind movement)।

একে Telekinesis (টেলিকাইনেসিস)ও বলা হয়। এর অর্থ দূর-সঞ্চালন শক্তি (distant movement)। এটি একটি মানসিক ক্ষমতা বা জোর যার দ্বারা কোন ব্যক্তি কোন বস্তুকে দৈহিকভাবে স্পর্শ না করে সরাতে বা নাড়াতে পারে। উদাহরণ স্বরূপ, ‘আরব্য রজনী’র আলী বাবার ‘সিসেম ফাঁক’ বলে ৪০ চোরের গুপ্তধন ভান্ডারের দরজা খোলা, আধ্যাত্মিক সাধকদের নিজ দেহকে শূণ্যে ভাসিয়ে বেড়ানো (levitating), কল্পবিজ্ঞানের প্রাণী বা বস্তুকে দূরে স্থানান্তর করা (teleport), প্রভৃতি।

আধ্যাত্মিক মনোবিদরা প্রবল মনো-সঞ্চালন শক্তির অস্তিত্ব স্বীকার করেন এবং এ নিয়ে গবেষণা করার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন। মনের জোর খাটিয়ে জুয়া খেলার ঘুঁটি (dices) এবং এলামেলো সংখ্যা (random number) পরিবর্তন করার উপর তারা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন ।

শুরুতে মনো-সঞ্চালন বা দূর-সঞ্চালন শক্তিকে মনে করা হতো মৃত ব্যক্তির প্রেতাত্মা, দুষ্ট জ্বীন, ভূত-পেত্নী বা অন্যান্য অতিপ্রাকৃতিক শক্তির কর্মকান্ড। পরে, এটিকে জীবিত মানুষেরও কাজ হতে পারে বলে বিশ্বাস করা শুরু হয়। ধরে নেয়া হতো যে, কিছু ব্যক্তি এরকম ক্ষমতার বলে মৃতের আত্মার কাছ থেকে বার্তা লাভের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে- যেমন অন্ধকার নিঃশব্দ ঘরে এবং নির্দিষ্ট ভাষায়- মৃত ব্যক্তির আত্মাকে হাজির করিয়ে তার আত্মীয়দের সাথে কথা বলা যায়। এর আরেক নাম ‘প্লানচেট’।

পরবর্তি ধাপে এটি আধ্যাত্মিক মনোবিদদের গবেষণার বিষয় রূপে গণ্য হয়। ১৯৩৪ সনে জে বি রাইন এ নিয়ে প্রথম গবেষণা শুরু করেন। কিছু কিছু গবেষক অনুমান করেন যে, কোন কোন ব্যক্তির দেহকোষে এমন একটি রস বা তরল পদার্থ (fluid) আছে যার সাহায্যে তিনি মনের এই প্রবল জোরের অধিকারী হন। এই রসের নাম psychode, psychic force, বা ectenic force। যাহোক, গবেষকরা মানব দেহকোষে এ ধরনের রসের অস্তিত্ব আজো খুঁজে পাননি বলে এটিকে অনুমানই মনে করেন।

আধুনিক কালে, প্যারাসাইকোলজি, গল্পের জগত এবং ‘নিউ এইজ’ বিশ্বাস মনো-সঞ্চালন শক্তিকে (সাইকোকাইনেসিস) একই ছাতার তলে অনেকগুলো সমস্যা সমাধানের সমাহার বলে দাবী করেন। তালিকা নিম্নে দেয়া হলো: |

(১)       শারীরিক উপশম (biological healing)।

(২)        ইলেকট্রনের নিয়ন্ত্রণ।

(৩)       চুম্বকত্ব নিয়ন্ত্রণ (control of magnetism)।

(৪)        ছায়া নিয়ন্ত্রণ (control of shadows) ।

(৫)       সময়ের নিয়ন্ত্রণ।

(৬)       শক্তি বর্ম সৃষ্টি (energy shield) ।

(৭)        ক্রীড়া ও খেলাধূলা, জুয়া, নির্বাচন, আয়ুস্কাল বর্ধিতকরণ প্রভৃতি ঘটনায় প্রভাব সৃষ্টি।

(৮)      বস্তুর পারম্পরিক বাস্তব অবস্থান নির্ধারণ।

(৯)       বস্তুর আকৃতির রূপান্তর/পরিবর্তন।

(১০)   চিন্তার আকার সৃজন অর্থাৎ মনের মধ্যে কোন ব্যক্তি বা বস্তুর আকৃতি তৈরী করে বাস্তবে তা হুবহু প্রদর্শন করা।

(১১)   বস্তুর রূপান্তর সাধন।

দূরসঞ্চালন শক্তি (টেলিকাইনেসিস) প্রয়োগ/ব্যবহার করে ব্যক্তি বা বস্তুকে অবস্থান থেকে নাড়ানো বা পরিবর্তন করা যায়/হয়। এগুলো দু’ধরণের। তালিকা নিম্নে উল্লেখ করা হলো:

(১)       সামগ্রিক/ম্যাক্রো-সঞ্চালন (Macro-telekinesis) যার মাধ্যমে বড় বস্তু বা জনতাকে নাড়ানো/পরিবর্তন করা যায়/হয়। এর অন্তর্গত:

(ক) পৃথিবী/গ্রহ নাড়ানো।

(খ) বৃক্ষ/উদ্ভিদ নাড়ানো।

(গ) নিজেকে শূণ্যে ভাসানো এবং উড়িয়ে নিয়ে অন্যত্র গমন।

(২)   ক্ষুদ্র/মাইক্রো-সঞ্চালন (Micro-telekinesis) যার মাধ্যমে পরমাণু (atoms), অণু (molecules) এবং কণিকা (particles) নাড়ানো যায়/হয়। এর অন্তর্গত:

(ক) ক্রায়োকাইনেসিস (Cryokinesis) বা তাপমাত্রা কমিয়ে/জমিয়ে বরফের মতো ঠান্ডা করা।

(খ) পাইরোকাইনেসিস (pyrokinesis) বা তাপ এবং আলোর বস্তুতে আগুন ধরানোর ক্ষমতা।

(গ) বাতাস/স্বাভাবিক বায়ু প্রবাহ এবং ঝড়ো হাওয়া, মেঘমালা এবং বায়বীয় অবস্থা পরিবর্তন করা।

(ঘ) জল/পানির প্রবাহে পরিবর্তন করা; স্থির জলে ঢেউ এবং ঢেউকে স্থির করা।

সাইকোকাইনেসিস (পিকেবা টেলিকাইনেসিসকে (টিকে) বিশ্বাসযোগ্য বা বাস্তব বলে মনে করার মতো কোন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনো মেলেনি। পিকে ও টিকের এক্সপেরিমেন্টের যথাযথ নিয়ন্ত্রণের (variable control)  এবং পুনরাবৃত্তি যোগ্যতার (repeatability) অভাব রয়েছে বলে সমালোচনা করা হয়। কিছূ কিছু ক্ষেত্রে পরিক্ষণ-ব্যক্তির (subject) মধ্যে এক ধরনের বিভ্রান্তি/অধ্যাস সৃষ্টি করা হয় এবং এ জন্য আগে থেকেই তাকে মানসিকভাবে প্রস্তুত বা বিশ্বাসী করা হয়। মনো-সঞ্চালন শক্তি বা ক্ষমতার (Psychokinesis)  উপায় বিজ্ঞানের এখনো অজানা ।

সংক্ষেপে, এই হচ্ছে মোটামুটি আধ্যাত্মিক মনোবিদ্যার গবেষণার ব্যাপ্তি। উল্লেখ্য যে, প্যারাসাইকোলজিক্যাল এসোসিয়েশন-এর মতে, আধ্যাত্মিক মনোবিদরা জ্যোতিষশাস্ত্র, অচেনা উড়ন্ত বস্তু (UFOs), বৃহদাকার লোমশ উল্লুক (Bigfoot), পৌত্তলিকতা (paganism), রক্তচোষা বাদুর (Vampire), কিমিতি/রসায়ন (alchemy) বা জাদুবিদ্যা (witchcraft) ইত্যাদি নিয়ে কাজ করেন না ।

ব্যতিক্রমধর্মী মনস্তত্ত্বাত্তিক প্রবণতা

বেশ কয়েকটি জরীপের সামগ্রিক পর্যালোচনায় পাওয়া গেছে যে, বহুলোক এমন কিছু অভিজ্ঞতার বিবরণ দেয়, যাকে বলা যায় মনালাপন বা আধ্যাত্মিক যোগাযোগ, ভবিষ্যদ্বাণী এবং অনুরূপ আরো অতীন্দ্রিক ঘটনাবলী। এসব ঘটনার সাথে আধ্যাত্মিক ক্ষমতার বিশ্বাসের যোগসূত্র পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে সম্মোহন, নিঃসঙ্গ জীবন-যাপন  এবং মনের সচেতন স্তরকে পরিবর্তন করার প্রবণতা বেশী। যারা খোলামেলা স্বভাবের, খ্যাপাটে এবং বহির্মুখী ব্যক্তিত্বের, তাদের মধ্যে এটা দেখা যায় না। তবে ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণ-বহির্ভূত মনোরোগ (সাইকোটিক), নিঃসঙ্গপ্রিয়তা (ডিসোসিয়েটিভ) সহ অন্যান্য তীব্র মানসিক রোগীদের মধ্যে আধ্যাত্মিক ক্ষমতা ও অভিজ্ঞতা প্রবল দেখা যায়।  তবে, আধ্যাত্মিক ক্ষমতায় যারা বিশ্বাসী সাধারণত তারা স্বাভাবিক বুদ্ধিসম্পন্ন হয় এবং তাদের মধ্যে  মানসিক অস্থিরতাজনিত ব্যাধি তেমন দেখা যায় না।

মানুষের মাঝে কোনো অতিপ্রাকৃত বা অতীন্দ্রিয় ক্ষমতার অস্তিত্ব আছে কি নেই, এই বিতর্কের সমাধান আজো হয়নি। কেউ বিশ্বাস করেন প্রবলভাবে, কারো কাছে ব্যাপারটা সম্পূর্ণ ভুয়া। বিজ্ঞানও কিন্তু এখন পর্যন্ত উড়িয়ে দিতে পারছে না সত্য হবার সম্ভাবনাকে, কেননা ভুরি ভুরি ঘটনা আছে যার ব্যাখ্যা বিজ্ঞান এখনও দিতে পারেনি। তবে সেই সাথে এও সত্যি যে আমাদের চেতন মনের চেয়ে অবচেতন মনটা অনেক বেশী শক্তিশালী। আর এই অবচেতন মন প্রায়ই আমাদেরকে নিয়ে এমন সব খেলা খেলে থাকে যে তাকে অতীন্দ্রিয় ক্ষমতা ভাবা যেতেই পারে!

মেকি/ভুয়া বিজ্ঞান (psuedoscience

পদার্থবিজ্ঞানী ও দার্শনিক ম্যারিও বান্জ (Mario Bunge) এর মতে, আধ্যাত্মিক বা অতীন্দ্রিক মনোবিদ্যা একটি মেকি বিজ্ঞান। কারণ:

*         এটি অস্তিত্বের স্বরূপকে (ontology) সঠিকরূপে সংজ্ঞায়িত করতে পারেনা এবং নির্ভুল চিন্তা থেকে দূরে এর অবস্থান।

*         এর তাত্ত্বিক অনুমান (hypothesis) প্রমাণ সাপেক্ষ নয়।

*         সামগ্রিকভাবে বিজ্ঞানের মতো তেমন অগ্রসর হয়নি।

*         গবেষণা করার মতো তত্ত্ব (theory) আজও দাঁড় করাতে পারেনি।

*         বিজ্ঞানের পদ্ধতি (experimental method) প্রয়োগ/ব্যবহারের প্রচেষ্টা থাকলেও বিষয়বস্তু অবৈজ্ঞানিক এবং তাত্ত্বিক ভিত্তি খুবই দুর্বল।

*         আধ্যাত্মিক মনোবিদ্যা গবেষণা বহির্ভূত এক বিশাল এলাকা।

তবে মার্কিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী, জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানী, মহাবিশ্বতত্ত্ববিদ ও লেখক কার্ল সাগান মন্তব্য করেছেন যে, আধ্যাত্মিক মনোবিদ্যার গবেষণার ক্ষেত্রে অন্তত তিনটি দাবী সত্য হতে পারে এবং এ নিয়ে গবেষণাও হতে পারে।

ক। চিন্তার দিক থেকে মানুষ একাই শুধু কম্পিউটারের মধ্যে এলোমেলো (Random) সংখ্যাকে প্রভাবিত/পরিবর্তন করতে পারে।

খ। কোন লোককে সাময়িকভাবে হালকা স্নায়বিক বঞ্চনায় রাখা হলে যে/যারা রাখে তার চাহিদা মতো চিন্তা ও কল্পনা করে থাকে।

গ। ছোট শিশুরা কখনো সখনো তাদের পূর্ব জন্মের জীবন নিয়ে গল্প করে, যা পূণপরীক্ষা করা হলে সত্যতা পাওয়া যায়, যা পূণর্জন্ম ছাড়া যে অন্য কোন কিছু তার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

শেষ কথা

জ্ঞান জগতে শেষ কথা বলতে আসলে কিছু নেই। এ এক অনন্ত পথ চলা। এ চলাই মানব বিবর্তন ও ক্রমবিকাশের/ ক্রমোন্নতির ধর্ম। এখানে শেষ কথা বলতে এই ক্ষুদ্র গবেষণা পত্রটির দুরূহ সিদ্ধান্ত টানার একটি প্রচষ্টাকে বুঝিয়েছি।

আধ্যাত্মিকতা বা অতীন্দ্রিয়বাদ একটি ভাববাদী দার্শনিক তত্ত্ব। এর সঙ্গে বিশ্বাসের সম্পর্ক নিবিঢ়। মানব সৃষ্টির আদি থেকে এ পর্যন্ত ব্যক্তি-মানব এবং মানব-সমাজের যে বিবর্তন ও ক্রমোন্নতি ঘটেছে তাতে ভাববাদের অবদান অনস্বীকার্য। অন্যদিকে বস্তুবাদ ও বিজ্ঞান যথাক্রমে যুক্তি ও বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা নির্ভর তত্ত্ব। সেখানে বিশ্বাসের কোন স্থান নেই। বস্তুবাদ ও বিজ্ঞান ব্যক্তি-মানব এবং মানব-সমাজে বিপ্লবী পরিবর্তন/রূপান্তর ঘটাতে সক্ষম হয়েছে। তবে ভাববাদ ও বস্তুবাদ এবং বিজ্ঞানের দ্বন্দ্ব বৈরী এবং বিপরীতমুখী। কেউ কারো তোয়াক্কা করেনা। অথচ ভাবজগৎ, বস্তুজগৎ ও বিজ্ঞানের পথ-নির্দেশক। কল্পনার জগৎ থেকেই মানুষ মহাকাশ, মহাসাগর ও দূর্গমকে জয় করার সাহস পেয়েছে।

আধ্যাত্মিক মনোবিদ্যার অবস্থান এ দু’টির মাঝখানে। এটি ভাববাদী (আধ্যাত্মিক বা অতীন্দ্রিক) ধারণাগুলোর অস্তিত্বের সত্যতা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে নির্ণয়ে ব্রতী। বেশীর্ভাগ ক্ষেত্রে সাফল্য এখনও আসেনি। উপরের আলোচনায় অন্ততঃ তাই প্রমাণিত হয়েছে। তবে দু’এক ক্ষেত্রে এর সত্যতা কিঞ্চিৎ হলেও মিলেছে। যেহেতু বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির সংজ্ঞা বা পরীক্ষার বাইরে তাই পদার্থ বিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান, চিকিৎসা মনেবিজ্ঞান এবং মনঃচিকিৎসা বিজ্ঞান এ সত্য স্বীকার করতে নারাজ। তাই আধ্যাত্মিক মনোবিদ্যাকে বলা হয় মেকি/ভুয়া বিজ্ঞান। কিন্তু তারপরও আধ্যাত্মিক মনোবিদরা হাল ছাড়েননি, দৃঢ়ভাবে তাদের গবেষণা কর্ম এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। ১৯৬৯ সনের আগে মানুষের চাঁদে গমন এক অবিশ্বাস্য কল্পনা ছিল কিন্তু এখন আর নয়।এমন বাস্তবতা এক্ষেত্রেও যে হবে না তা কে বলতে পারে।

আমরা, সাধারণ মানুষ ভাববাদী ও বস্তুবাদী দর্শন, ধর্ম ও বিজ্ঞান, বিশ্বাস ও পরীক্ষণ নির্ভর সত্যতার দ্বন্দ্বের মাঝখানে দেয়াল ঘড়ির পেন্ডুলামের মতো দুলছি। ঝগড়া-বিবাদ করছি। সংঘাত-যুদ্ধে লিপ্ত হচ্ছি। পশ্চিম-পূর্ব, ধনী-দরিদ্র, প্রভূ-ভৃত্য, শোষক-শোষিত, সভ্য-বর্বর, সাদা-কাল, আশরাফ-আতরাফ, ব্রাহ্মণ-শূদ্র, উচ্চ-নীচ ইত্যাদিতে বিভক্ত হয়ে আছি। কিন্তু আসলে তো আমরা একটাই মানব জাতি।

এই নেতিবাচক দিকের পাশাপাশি এটাও সত্য যে মানবজাতি বিবর্তন বা সংস্কার এবং বিপ্লব উভয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই এগুচ্ছে।

আমরা পৃথিবীর বাইরে গ্রহ, নক্ষত্র ও মহাবিশ্বকে জানার ক্ষেত্রে অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছি, এটা যেমন সত্য তেমনি তার বিপরীতে এটাও সত্য যে, মানুষ তার নিজেকে এবং একজন আরেকজনকে কতদূর জানার চেষ্টা করেছি বা জানতে পেরেছি, তা প্রশ্ন সাপেক্ষ। ভাববাদ ও বস্তুবাদ দুটোই মানুষের চিন্তার হাতিয়ার। মানুষ যদি নিজেকে সঠিকভাবে জানতে পারে / আবিষ্কার করতে পারে এবং পাশাপাশি অন্যকেও, তবে সম্ভবত এই সংঘাতময় বৈরী দ্বন্দ্বের নিরসন করে অবৈরি বা মিলনাত্মক সম্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব। যদি এমনটা করা যায় বা হয় তবে মানুষের সামগ্রিক উন্নতির ক্ষেত্রে বিবর্তনের চেয়ে বিপ্লবী পরিবর্তনই ঘটবে বেশী।

তাই শেষ কথা হিসেবে সক্রেটিসের উক্তিটি পূর্ণব্যক্ত করতে হয়,‘নিজেকে জানো’(know thyself)। আর নিজেকে জানতে হলে একটাই উপায় – জ্ঞান চর্চা করতে হবে নিরন্তর! ‘অধ্যয়নং তপঃ’।

আধ্যাত্মিক সাধনা

$
0
0

আমরা হানাফি মাযহাবের অনুসারী। আমাদের ইমামের নাম আবু হানিফা। তার আসল নাম নোমান বিন সাবেত।  তিনি তাবেঈ ছিলেন। তিনি বাগদাদে একশত পঞ্চাশ হিজ্জরিতে ইন্তেকাল করেন। এটা তার অতিসংক্ষিপ্ত পরিচয়; তবে আমরা এখানে তার অধ্যাত্মিকতা সম্পর্কে জানব।
বড় বড় ব্যক্তিদের দৃষ্টিকোণ থেকে মনে করা হত যে, অন্য ব্যক্তিরা যেভাবে তাসাউফের চিন্তা ভাবনা থেকে অনেক দূরে তেমনি ইমাম আবু হানিফা রহ. ও অনেক দূরে ছিলেন। কিন্তু তাদের ধারণা সঠিক না; বরং আহলে তাসাউফ ও আহলে সুলুকগণ তাসাউফ সম্পর্কে যে দিক নির্দেশনা দিয়েছেন তার বহু আগ থেকে যদি গভীর দৃষ্টিপাত করা হয় এবং আবু হানিফা রহ. এর জীবনযাপন ও কর্মের দিকে নজর দেয়া হয় তাহলে তার দিনরজনীতে তাসাউফের সফল রুপরেখা ফুটে উঠে। তার ব্যক্তিগত জীবনেও অনুগ্রহ, উত্তম রীতিনীতি ছিল পরিপূর্ণ হারে। এমনকি তাসাউফ বা এসলাহী তাসাউফ শব্দগুলো পারিভাষিক ব্যবহারে আসার পূর্বেই ইমাম আবু হানিফা রহ. ইলমী জীবনপ্রবাহে তার পরিচয় মিলে। যেমন র্দুরে মুখতার কিতাবের লেখক, আল্লামা মুহাম্মদ বিন আলী বিন মুহাম্মদ বিন আবদুর রহমান বিন হাছকুফি রহ. [মৃত্যু ১০ ই শাওয়াল ১০৮৮ হিজ্জরি] বলেন, আমি ইলমে তাসাউফ অর্জন করেছি- হযরত শিবলী রহ. থেকে, তিনি হযরত ছিররী সকতী থেকে, তিনি হযরত মারুফ কারখী রহ. থেকে, তিনি হযরত দাউদ তায়ী থেকে, তিনি ইলমে তাসাউফ ইলমে হাদীস এবং ইলমে ফিকাহ অর্জন করেছেন ইমাম আবু হানিফা নুমান বিন সাবেত রহ. থেকে। এটা শুধু ইমাম আবু হানিফা রহ. এর মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিলনা বরং বর্ণনা করা হয়েছে যে, শতশত শতাব্দীর মাঝে এমন চার জন শেষ্ঠ মানব ছিলেন যারা তাসাউফের মধ্যে থাকার কারণে তাদের জীবন মর্যাদা এবং অবস্থান উজ্জল নক্ষত্রের ন্যায় আলোকিত হয়েছে। ইমাম মহিউদ্দিন শরীফ নদভি তার কিতাব “আল মাকসাদ” এর আধ্যাত্মিক সাধনার পাঁচটি উসুল বা মূলনীতি বর্ণনা করেন। নিম্নে তা তুলে ধরা হলো।
এক. নির্জনতায় বা অনির্জনতায় সর্বাবস্থায় আল্লাহ তাআলার তাকওয়া অবলম্বন করা।
দুই. কোন কাজ বা উপদেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে হুজুর পাক সা. এর কাজ বা উপদেশ অনুসরণ করা।
তিন. সম্মানিত, লাঞ্চিত ও কৃতজ্ঞসহ সর্বাবস্থায় সৃষ্টিজীবের উপর ভরসা বিলকুল না করা।
চার. অধিক বা স্বল্প রিযিকে আল্লাহর উপর কৃতজ্ঞ থাকা।
সুঃখে দুঃখে আল্লাহর প্রতি মনোনিবেশ থাকা।
তদ্রুপ জুনাঈদ বাগদাদী রহ. ও অধ্যাত্মিক তরিকার উপর পাচঁটি মূলনীতি বর্ণনা করেছেন।
এক. দিনের বেলায় রোযা রাখা।
দুই. রাতের বেলায় নামাযে মশগুল থাকা।
তিন. কোন আমল লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে না করে ইখলাসের সাথে আমল করা।
চার. কোন কাজ তথা আমল করার সময় মনোযোগ দিয়ে করা।
পাচঁ. যে কোন অবস্থায় বা পরিস্থিতিতে আল্লাহর উপর ভরসা করা।
আবু হানিফা রহ. এর সমস্ত জীবন যে তাসাউফের বিশষত্বের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিল এ ব্যাপারে সকল ঐতিহাসিক ও আলোচনা বিশ্লেষকগণ এক মত। তবে ইমাম আবু হানিফা রহ. এর নামের সাথে সুফি শব্দ বা তার ধারাবাহিকতার ব্যবহার ছিলনা। তবে ইমাম আবু হানিফা রহ. এর তাসাউফ ও সুফিদের সাথে সম্পৃক্ততা উল্লেখ করে, সুফিশাস্রের প্রশিদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য কিতাব  ‘আলফুতুহাত ওয়াল আযওয়াক’ এর গ্রন্থকার লিখেন, হযরত আবু হানিফা রহ. সুফিদের খুব ভালবাসতেন। তিনি শুধু ভালই বাসতেন না বরং তাদের আধ্যাত্মিকতার স্তর ও জীবনযাত্রাকে অনেক সম্মান করতেন।
প্রাচ্যবিদগণ দ্রুত ইসলমী ইলম ও শিক্ষাকে আবশ্যকীয়ভাবে মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেয়া ও সুন্দর একটি রুপে রুপান্তরিত করার জন্য তার প্রতি বিশেষ মনোনিবেশ করেন। এমনিভাবে তাসাউফকে সুন্দর করার জন্য খুবই চেষ্টা করেন। তাই আসহাবে কুলুব এবং সাহিত্যিকগণ তাদের লিখনী বা যে কোনো কাজে প্রাচ্যবিদগণের ইলমের বেশি অনুসরণ করেন। আর এই একনিষ্ট ব্যক্তিবর্গের অক্লান্ত পরিশ্রমের প্রচেষ্টায় আজ পর্যন্ত এই ইসলামী শাস্ত্র ও ইলমের প্রকৃত ছবি বিদ্যমান দেখতে পাই।
যাহোক এখানে আমরা লক্ষ করব প্রকৃত তাসাউফ কোনটি? নিচে তাসাউফের সঙ্গা ও তার প্রকারভেদ উল্লেখ করা  হলো। তাসাউফকে দুভাগে ভাগ করা যায়।
এক. ইসবাত তথা ইতিবাচক: আর ইতিবাচক তাসাউফ বলা হয় ঐ তাসাউফকে যা বেদআত ও প্রচলিত কুপ্রথা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত এবং তার মধ্যে কুরআন ও হাদীস দ্বারা পরিপূর্ণ জীবনযাত্রা ও সুগম পথ পরিচালনা শিক্ষা দেয়া হয়।
দুই. নফি বা নিতিবাচক:  আর নিতিবাচক তাসাউফ বলা হয় ঐ তাসাউফকে যার মধ্যে পরিপূর্ণভাবে বিদাআত, প্রচলিত কুপ্রথা ও অশ্লীল কথাবার্তা পরিপূর্ণভাবে পাওয়া যায়। আর ২য় তাসাউফের উৎপত্তি প্রাচ্যদেশ থেকেই উদঘাটন হয়। এসব দেশের সরলমনা মানুষরা ২য় বিষয়গুলো দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তাসাউফের জ্ঞান ও শিক্ষাকে পুরাপুরিভাবে অস্বীকার করে। এরা শুধু এতেই ক্ষ্যান্ত হয়নি বরং এর বিরুদ্ধে প্রস্তুতমূলকভাবে প্রতিদ্বন্দ্বি হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু ইমাম আবু হানিফা রহ. এর জীবন অধ্যাত্মিকতার ইলম ও আমল দ্বারা পরিপূর্ণ ছিল। সকল আহলে সালেকগণ ঐক্যমত হন যে, তাসাউফের সূচনা আমীরুর মুমিনিন হযরত আলী বিন আবি তালিব রা. থেকে হয়। এমনকি তিনি সূফিগণের সরদারও ছিলেন। হযরত আবু হানিফা রহ. এর দাদার আসল নাম ছিল জাওযাহ। তিনি ইসলাম গ্রহণ করার পর নাম রাখা হয় নোমান। আর জাওযাহ তথা নোমানের সাথে হযরত আলী রা. এর খুব ভাল সম্পর্ক ছিল। এই নোমানের ঘরে একটা ছেলে সন্তান হয়, নাম রাখা হয় সাবেত। নোমান তার নবজাতক সাবেত কে নিয়ে হযরত আলী রা. কাছে যান, ছেলের জন্য দোআ নিতে। আলী রা. তার মাথায় হাত বুলিয়ে দোআ করে দেন। তারপর সাবেত বিন নোমানের কোল জুরে আসে এক ছেলে সন্তান। সাবেত তার ছেলের নাম রাখেন বাবার নামে, তথা নোমান। যার অপর নাম হলো আবু হানিফা। নসবনামা হলো নোমান বিন সাবেত বিন নোমান। এদ্বারাই বুঝা যায় ইমাম আবু হানিফা রহ. এর সম্পর্ক আমীরুল মুমিনিন হযরত আলী রা. এর সাথে কেমন ছিল। এছাড়াও অন্য আরেকটা সম্পর্ক আছে, তা হলো তার উস্তাদদের উস্তাদগণের নামের তালিকায় হযরত আলী রা. এর নাম উঠে আসে। এই গুণের কারনেই হযরত দাউদ তায়ী রহ. এর উস্তাদগণের নামের মাঝে হযরত আবু হানিফা রহ. এর নাম একজন হক্কানী উস্তাদ হিসাবে পাওয়া যায়। এ থেকেই বুঝা যায় ঈমাম আবু হানিফা রহ. আধ্যাত্মিকতায় কতো উপরে ছিলেন। আল্লাহ আমাদের বুঝার তাওফিক দান করুন এবং আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে পুতপবিত্র জীবন যাপন করার তাওফিক দান করুন। আমীন।
লেখক: শিক্ষার্থী মালিবাগ মাদরাসা,
ইমামে আযম এবং আধ্যাত্মিক সাধনা : আবদুল্লাহ জামিউ আযম জীম
আমরা হানাফি মাযহাবের অনুসারী। আমাদের ইমামের নাম আবু হানিফা। তার আসল নাম নোমান বিন সাবেত।  তিনি তাবেঈ ছিলেন। তিনি বাগদাদে একশত পঞ্চাশ হিজ্জরিতে ইন্তেকাল করেন। এটা তার অতিসংক্ষিপ্ত পরিচয়; তবে আমরা এখানে তার অধ্যাত্মিকতা সম্পর্কে জানব।
বড় বড় ব্যক্তিদের দৃষ্টিকোণ থেকে মনে করা হত যে, অন্য ব্যক্তিরা যেভাবে তাসাউফের চিন্তা ভাবনা থেকে অনেক দূরে তেমনি ইমাম আবু হানিফা রহ. ও অনেক দূরে ছিলেন। কিন্তু তাদের ধারণা সঠিক না; বরং আহলে তাসাউফ ও আহলে সুলুকগণ তাসাউফ সম্পর্কে যে দিক নির্দেশনা দিয়েছেন তার বহু আগ থেকে যদি গভীর দৃষ্টিপাত করা হয় এবং আবু হানিফা রহ. এর জীবনযাপন ও কর্মের দিকে নজর দেয়া হয় তাহলে তার দিনরজনীতে তাসাউফের সফল রুপরেখা ফুটে উঠে। তার ব্যক্তিগত জীবনেও অনুগ্রহ, উত্তম রীতিনীতি ছিল পরিপূর্ণ হারে। এমনকি তাসাউফ বা এসলাহী তাসাউফ শব্দগুলো পারিভাষিক ব্যবহারে আসার পূর্বেই ইমাম আবু হানিফা রহ. ইলমী জীবনপ্রবাহে তার পরিচয় মিলে। যেমন র্দুরে মুখতার কিতাবের লেখক, আল্লামা মুহাম্মদ বিন আলী বিন মুহাম্মদ বিন আবদুর রহমান বিন হাছকুফি রহ. [মৃত্যু ১০ ই শাওয়াল ১০৮৮ হিজ্জরি] বলেন, আমি ইলমে তাসাউফ অর্জন করেছি- হযরত শিবলী রহ. থেকে, তিনি হযরত ছিররী সকতী থেকে, তিনি হযরত মারুফ কারখী রহ. থেকে, তিনি হযরত দাউদ তায়ী থেকে, তিনি ইলমে তাসাউফ ইলমে হাদীস এবং ইলমে ফিকাহ অর্জন করেছেন ইমাম আবু হানিফা নুমান বিন সাবেত রহ. থেকে। এটা শুধু ইমাম আবু হানিফা রহ. এর মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিলনা বরং বর্ণনা করা হয়েছে যে, শতশত শতাব্দীর মাঝে এমন চার জন শেষ্ঠ মানব ছিলেন যারা তাসাউফের মধ্যে থাকার কারণে তাদের জীবন মর্যাদা এবং অবস্থান উজ্জল নক্ষত্রের ন্যায় আলোকিত হয়েছে। ইমাম মহিউদ্দিন শরীফ নদভি তার কিতাব “আল মাকসাদ” এর আধ্যাত্মিক সাধনার পাঁচটি উসুল বা মূলনীতি বর্ণনা করেন। নিম্নে তা তুলে ধরা হলো।
এক. নির্জনতায় বা অনির্জনতায় সর্বাবস্থায় আল্লাহ তাআলার তাকওয়া অবলম্বন করা।
দুই. কোন কাজ বা উপদেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে হুজুর পাক সা. এর কাজ বা উপদেশ অনুসরণ করা।
তিন. সম্মানিত, লাঞ্চিত ও কৃতজ্ঞসহ সর্বাবস্থায় সৃষ্টিজীবের উপর ভরসা বিলকুল না করা।
চার. অধিক বা স্বল্প রিযিকে আল্লাহর উপর কৃতজ্ঞ থাকা।
সুঃখে দুঃখে আল্লাহর প্রতি মনোনিবেশ থাকা।
তদ্রুপ জুনাঈদ বাগদাদী রহ. ও অধ্যাত্মিক তরিকার উপর পাচঁটি মূলনীতি বর্ণনা করেছেন।
এক. দিনের বেলায় রোযা রাখা।
দুই. রাতের বেলায় নামাযে মশগুল থাকা।
তিন. কোন আমল লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে না করে ইখলাসের সাথে আমল করা।
চার. কোন কাজ তথা আমল করার সময় মনোযোগ দিয়ে করা।
পাচঁ. যে কোন অবস্থায় বা পরিস্থিতিতে আল্লাহর উপর ভরসা করা।
আবু হানিফা রহ. এর সমস্ত জীবন যে তাসাউফের বিশষত্বের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিল এ ব্যাপারে সকল ঐতিহাসিক ও আলোচনা বিশ্লেষকগণ এক মত। তবে ইমাম আবু হানিফা রহ. এর নামের সাথে সুফি শব্দ বা তার ধারাবাহিকতার ব্যবহার ছিলনা। তবে ইমাম আবু হানিফা রহ. এর তাসাউফ ও সুফিদের সাথে সম্পৃক্ততা উল্লেখ করে, সুফিশাস্রের প্রশিদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য কিতাব  ‘আলফুতুহাত ওয়াল আযওয়াক’ এর গ্রন্থকার লিখেন, হযরত আবু হানিফা রহ. সুফিদের খুব ভালবাসতেন। তিনি শুধু ভালই বাসতেন না বরং তাদের আধ্যাত্মিকতার স্তর ও জীবনযাত্রাকে অনেক সম্মান করতেন।

সুফিবাদের ক্রমবিকাশ

$
0
0
আধ্যাত্মিক জ্ঞানের নাম হলো সুফিবাদ। মানুষের জীবন আত্মা ও দেহের সমন্বয়ে গঠিত। সুফিবাদের যে জ্ঞানের সাহায্যে আত্মাকে পরিশুদ্ধ করা হয়, তাকে বলা হয় এলমে তাসাউফ।
‘সুফি’ শব্দের উৎপত্তি
ইবনে খালিদুন, ড. এ. ই আফিফি, আল-কালবাদি, আর-রুদবারি, আবু নসর আস-সাররাজ প্রমুখ প-িতদের মতে, ‘সুফি’ শব্দটি সুফুন থেকে নির্গত; যার অর্থ পশম। পশমি বস্ত্র সরলতা ও আড়ম্বরহীনতার প্রতীক। হজরত মুহাম্মদ (সা.) ও তাঁর সাহাবিরা বিলাসী জীবনযাপনের পরিবর্তে সাদাসিধে পোশাক পরতেন এবং পরবর্তীকালে সুফিরা সাদাসিধে জীবনযাপনের জন্য এই পোশাক গ্রহণ করে কম্বল-সম্বল করে চলেন বলে তাঁদের সুফি বলা হয়। আলী হাজাবিরি, মোল্লা জামি (র.)-এর মতে, সুফি কথাটি সাফা থেকে নির্গত, যার অর্থ পবিত্রতা, আত্মশুদ্বি ও সচ্ছলতা। যাঁরা আত্মার শুদ্ধির সাধনায় নিয়োজিত থাকেন, তাঁদের সুফি বলা হয়।
সুফিবাদ
মুসলিম দার্শনিকেরা ও আধ্যাত্মিক সাধনায় সাধনাকারী ব্যক্তিরা বিভিন্নভাবে সুফিবাদের সংজ্ঞা প্রদান করেছেন। ইমাম শামি (র.) বলেন, ‘সুফিবাদ হলো আধ্যত্মিক জ্ঞান যে জ্ঞানের সাহায্যে মানুষের সদগুণাবলির প্রকারভেদ এবং তা অর্জনের পন্থা ও অসদগুণাবলির প্রকারভেদ ও তা থেকে রক্ষার উপায় জানা যায়।’ ইমাম গাজ্জালি (র.) বলেন, ‘তাসাউফ এমন একটি বিদ্যা, যা মানুষকে পশু থেকে উন্নীত করে মনুষ্যত্বের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে দেয়।’ উল্লিখিত সংজ্ঞাগুলো পর্যালোচনায় বলা যায়, নবী করিম (সা.)-এর নির্দেশিত পথে আত্মশুদ্ধি করে ইসলামের বাহ্য ও অন্তর জীবনের প্রেমপূর্ণ বাস্তব অনুশীলনের মাধ্যমে পরম সত্তার পূর্ণ জ্ঞানার্জন ও তার নৈকট্য লাভজনিত রহস্যময় উপলব্ধিকে সুফিবাদ বলা হয়।
সুফিবাদের উৎপত্তি
সুফিবাদের উৎপত্তি সম্পর্কে প-িতদের মধ্যে মতবিরোধ লক্ষ করা যায়। তাঁদের মতামতগুলো পর্যালোচনায় যা পাওয়া যায়-১. বেদান্ত ও বৌদ্ধ দর্শনের প্রভাব; ২. খ্রিস্টীয় ও নিও-পেটানিক প্রভাব; ৩. পারসিক প্রভাব ও ৪. কোরআন-হাদিসের প্রভাব। প্রথম তিনটি মতবাদকে অভ্যন্তরীণ মতবাদ বলা হয় আর শেষেরটিকে বলা হয় বাহ্যিক উৎস। পাশ্চাত্যের কিছু চিন্তাবিদ তথা গোল্ডজিহার, এইচ মার্টেন প্রমুখদের মতে, সুফিবাদ বেদান্ত দর্শন ও বৌদ্ধ দর্শন থেকে উদ্ভূত। কিন্তু হাসান বসরি, জুন্নুন মিসরি, আবুল হাশিম কুফি, ইব্রাহীম বিন আদহাম, রাবেয়া বসরি প্রমুখ সুফিদের আবির্ভাব ও সাধনা প্রমাণ করে, সুফিবাদ ভারতীয় পণ্য নয়, বরং ইসলামের আধ্যাত্মিক শিক্ষার ফলে সুফিবাদের উদ্ভব ঘটে। উল্লেখ্য, বৌদ্ধধর্মে নির্বাণ সত্তায় আত্মবিলোপ শেষ স্তর হলেও মুসলিম সুফিরা ফানাকে শেষ স্তর বলে মনে করেন না বরং তাঁরা বাকাবিল্লাহকে সুফি-পথপরিক্রমার সর্বশেষ স্তর মনে করে থাকেন। তাই অধ্যাপক নিকলসন ও ভনক্রেমার এ মতামত ব্যক্ত করেছেন যে, মুসলমানদের ভেতর সুফিবাদের আবির্ভাব ঘটেছে খ্রিস্টীয় ও নিওপ্লেটনিক মতবাদ থেকে। কিন্তু তাদের বিপরীতে যুক্তি হলো, মুসলিম সুফি-সাধকেরা খ্রিস্টীয় সন্যাসীদের মতো সংসার-বিরাগী নয়। ঐতিহাসিক ব্রাউনি ও তাঁর অনুসারীদের মতে, সুফিবাদের উৎপত্তি ঘটেছে পারসিক প্রভাব থেকে। কিন্তু এ মতও সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও ভিত্তিহীন। কারণ আবু বকর ইবনুল আরাবি ও ইবনুল ফরিদসহ অনেক দার্শনিক আরবিভাষী ছিলেন। প্রকৃত অর্থে, ইসলামি আধ্যাত্মিক শিক্ষার মূল উৎস হলো কোরআন। যদিও কোরআন ও হাদিসে ‘সুফিবাদ’ শব্দটি সরাসরি ব্যবহার করা হয়নি; তবে অসংখ্য আয়াত ও হাদিস দ্বারা সুফিবাদ তথা আধ্যাত্মিক জ্ঞানের দিকে বিশেষভাবে উৎসাহিত করা হয়েছে। ইবনে খালদুন অত্যন্ত জোর গলায় বলেন, ‘সুফিবাদ এমন এক ধর্মীয় বিজ্ঞান, যার উৎপত্তি খোদ ইসলাম থেকে হয়েছে।’
কোরআনের অসংখ্য আয়াত রয়েছে, যার দ্বারা মরমিধারাকে ইসলাম বিশেষভাবে উৎসাহিত করা হয়েছে। যেমন ১. ‘তাঁর সিংহাসন সমস্ত আসমান ও জমিনকে পরিবেষ্টিত করে আছে।’ (বাকারা : ২৫৫) ২. ‘তিনিই প্রথম, তিনিই সর্বশেষ, তিনিই প্রকাশমান ও অপ্রকাশমান এবং তিনি সব বিষয়ে সম্যক পরিজ্ঞাত।’ (হাদিদ : ৩) ৩. ‘তিনি তোমাদের সাথে আছেন তোমরা যেখানেই থাকো।’ (হাদিদ : ৪) ৪. ‘তারা খাঁটি মনে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে।’ (বাইয়েনা : ৫) হাদিসেও তাসাউফের কথা অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয়।
একবার রাসুলে করিম (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে ইহসান কী? তিনি উত্তরে বলেছিলেন, ‘ইহসান হলো এ বিষয় যে, তুমি যখন নামাজ পড়বে, তখন তুমি এ মনে করবে যে, আল্লাহকে তুমি দেখছ আর তাও যদি সম্ভব না হয় তাহলে এই মনে করবে যে, আল্লাহ তোমাকে দেখছেন।’ অর্থাৎ কোরআনের আয়াত ও হাদিস দ্বারা এ কথা অকাট্যভাবে প্রমাণিত যে সুফিবাদ কোরআন-হাদিস থেকে নিঃসৃত একধরনের বাতেনি জ্ঞান। নবী করিম (সা.) হেরা গুহায় গভীর ধ্যানে নিমজ্জিত থাকতেন, যার দ্বারা বোঝা যায় তিনি আধ্যাত্মিক জীবন সাধনায় প্রায় সময় ব্যস্ত থাকতেন। কোরআন-হাদিসে সুফিবাদকে বিভিন্ন নামে নামকরণ করা হয়েছে। যেমন এলমে বাতেনি, এলমে লাদুনি, এলমে তরিকত, এলমে মারফত।
সুফিবাদের ক্রমবিকাশ
সর্বপ্রথম মুসলিম সুফি হিসেবে চিহ্নিত করা হয় হজরত হাসান বসরি (র.)-কে। তাঁর জ্ঞানতত্ত্বের আলোকে পরবর্তী সুফি-সাধকেরা সুফিবাদের ক্রমবিকাশে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছেন। ভিন্নমতে, সর্বপ্রথম সুফি হিসেবে যাঁর নাম স্বীকৃতি দেওয়া হয়, তিনি হলেন আবয় হাশিম কুফি। হিজরী দ্বিতীয় শতকে সুফিবাদের জনপ্রিয়তা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেতে থাকে। এ সময়ের উল্লেখযোগ্য সুফিরা হলেন ইব্রাহীম বিন আদহাম, রাবেয়া বসরি, দাউদ আততায়ী ও ফুজায়ল বিন হাইয়াজ প্রমুখ। পরবর্তীকালে সুফিবাদের ক্রমবিকাশে ব্যাপক ভূমিকা পালন করেন জুন্নুন মিসরি। তিনি সুফিবাদের সর্বপ্রথম ব্যাখ্যাদানকারী।
কালক্রমে সুফিবাদে সর্বেশ্ববাদের ধারণা যুক্ত হতে থাকে। এ ধরনের মতবাদের মূল প্রবক্তা বায়েজিদ বোস্তামী ও মানসুর হাল্লাজ। তবে মানসুর হাল্লাজের বক্তব্য কিছুটা বিতর্কিত ছিল। অতঃপর ইমাম গাজ্জালির সময় থেকে সুন্নিবাদী মতবাদ সুফিবাদের ভেতরে একটি বিশেষ স্থান দখল করে নেয়। তিনি গোড়া ইসলাম ও সুফিবাদের মধ্যে সুন্দর সমন্বয় করেন। তার সময়ের সুফিদের মধ্যে আবদুল কাদের জিলানি, ফরিদ উদ্দিন আত্তার, আল-কুশাউরি, শিহাবুদ্দিন সোহরাওয়ার্দীর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সপ্তম হিজরিতে স্পেনে ইবনুল আরাবি সর্বেশ্বরবাদের প্রচলন করেন। তাঁর মরমি ধারার ক্রমবিকাশে সাহায্য করেছিলেন জালালুদ্দিন রুমি (র.)। অতঃপর ভারতীয় উপমহাদেশে অনেক সুফির আবির্ভাব ঘটে, যাঁদের মধ্যে খাজা মইনুদ্দিন চিশতি, মুজাদ্দেদ আলফেসানির নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

ইসলামের প্রচার ও প্রসারে সুফি সাধকগণের অবদান

$
0
0

মানবজাতির জন্য মহান আল্লাহর দেয়া পূর্ণাঙ্গ ও সর্বজনীন জীবন বিধান হিসেবে বিশ্বের সব দেশে ইসলামের প্রচার ও প্রসার হওয়াটা স্বাভাবিক, কিন্তু বাংলাদেশে (প্রাচীন বঙ্গদেশে) কবে সর্বপ্রথম ইসলামের অবির্ভাব ঘটেছিল, তা আজও নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। হয়তো বা কোনো সাহাবার মাধ্যমেই সর্বপ্রথম এদেশে ইসলামের আবির্ভাব হয়েছিল। অবশ্য এটা নিশ্চিত বলা যায় যে, আরব মুসলমানদের মাধ্যমেই সর্বপ্রথম এদেশে ইসলামের আবির্ভাব হয়েছে এবং পরবর্তীকালে আউলিয়ায়ে কেরাম ও সুফিয়ানে ইজামদের মাধ্যমে বাংলাদেশে ইসলামের প্রচার ও প্রসার হয়েছে। নূরে মুজাসসাম হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবির্ভাবের বহুকাল আগ থেকেই বাংলাদেশের সাথে আরবদের ব্যবসায়ের সম্পর্ক ছিল। এমনকি হজরত ঈসা আলাইহিস সালাম জন্মের কয়েক হাজার বছর আগেও দক্ষিণ আরবের সাবা কওমের ব্যবসায়ীরা পালতোলা জাহাজে করে এদেশে আসত। ওই সাবা কওমের নামানুসারে নামকরণকৃত শহর সাবাউর (উর অর্থ শহর) সাবাউর অর্থাত্ সাবাদের শহর আজও ঢাকার অদূরে সাভার নামে পরিচিত হয়ে এদেশে সাবা কওমের আগমন স্মৃতি বহন করছে। ঈসায়ী ত্রয়োদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে পাক-ভারত ও বাংলাদেশ উপমহাদেশের ব্যাপকভাবে প্রথম ইতিহাস লেখন মওলানা মিনহাজুদ্দীন সিরাজ উত্তর বাংলাদেশকে ‘বাররিন্দ’ বলেছেন। যা পরে ‘বরেন্দ্র’ নামে পরিচিত হয়েছে। এ অঞ্চলকে ‘বাররিন্দ্র’ বলার কারণ ছিল এই যে, আরবরা বিশাল সমুদ্র, সাগর, মহাসাগর পাড়ি দিয়ে জহাজে ভেসে ভেসে বহুদিন পর বঙ্গদেশে তদানীন্তন হিন্দের মাটি বা স্থল দেখে অনন্দে নেচে উঠে চিত্কার করে বলত ‘বাররি হিন্দ’ অর্থাত্ হিন্দের মাটি, যা পরবর্তীকাল বাররিন্দ বা বরেন্দ্রতে পরিবর্তিত হয়ে যায়। এ ছাড়া আরও বহু প্রমাণাদি পাওয়া যায় যাতে পরিষ্কার বোঝা যায় যে নূরে মুজাসসাম হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, আবির্ভাবপূর্ব যুগে বাংলাদেশের সাথে আরবদের ব্যবসা ছিল এবং প্রথম হিজরি শতাব্দীর অর্থাত্ ‘ঈসায়ী’ ৭ম শতাব্দীর মধ্যেই তদানীন্তন হিন্দ তথা বাংলাদেশের সাথে আরব মুসলমানদের সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে এবং তারা এদেশে ইসলামের আলো পৌঁছিয়েছেন।

নূরে মুজাসসাম হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবাগণের আবির্ভাবের মাধ্যমে হিজরি প্রথম শতাব্দীতে সুদূর চীনে ইসলামের আবির্ভাব প্রমাণিত হয়েছে। গবেষণা সাপেক্ষে বাংলাদেশেও নূরে মুজাসসাম হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবাও তাবিয়ীগণের মাধ্যমেই ইসলামের আবির্ভাব হয়তো প্রমাণিত হবে। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে,নূরে মুজাসসাম হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবির্ভাবের বহুকাল আগ থেকেই হিন্দ তথা বাংলাদেশের সাথে আরবদের সওদাগরি যোগাযোগ ছিল। ইসলামের আবির্ভাবের পর ওই যোগাযোগ কমেনি, বরং বেড়েছে। সুতরাং নূরে মুজাসসাম হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নবুওয়াত প্রাপ্তির পর তার বিছাল শরিফ পর্যন্ত ২৩ বছরে দীর্ঘ সময়ের মধ্যে একজন সাহাবাও ইসলাম প্রচার অথবা সওদাগর হিসেবে ব্যবসায়ের কারণে এদেশে আসেননি, এটা কি করে চিন্তা করা যায়। অবশ্য কোনো সাহাবা বা তাবেয়ী এদেশে এসেছেন বা ইসলাম প্রচার করেছেন—এমন প্রমাণ এ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। শুধু তাই নয়,নূরে মুজাসসাম হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বিছাল শরিফের পর হিজরি প্রথম শতাব্দীর শেষ পর্যন্তও সাহাবাগণ জীবিত ছিলেন। সুতরাং হজরতের নবুওয়াত প্রাপ্তির পর থেকে সহাবাগণের জীবনকাল সমাপ্তি পর্যন্ত (নবুওয়াতের ১৩ বছর পর হিজরত, হিজরতের পরও ১০০ বছর পর্যন্ত সাহাবাগণের সম্ভাব্য জীবনকাল) ১০ + ১০০ + = ১১০ বছরের মধ্যে কোনো কারণে এদেশে একজন সাহাবারও আবির্ভাব ঘটেনি-এটাও চিন্তা করা যায় না। অথচ সুদূর স্পেনে যার দূরত্ব মদিনা থেকে বাংলাদেশের তুলনায় অনেকগুণ বেশি এবংনূরে মুজাসসাম হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবির্ভাবের আগে স্পেনের সাথে আরবদের কোনো যেগাযোগ ছিল না, সেখানে মুনাইজির রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু (মৃত্যু আনু: ৮০ হি ) নামক সাহাবার অবির্ভাব প্রমাণিত হয়েছে। অন্যদিকে, হিন্দ থেকে লোক গিয়ে নূরে মুজাসসাম হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাছে ইসলাম গ্রহণ করেছেন বলেও জানা যায়। এ প্রসঙ্গে বাবা রতন আল-হিন্দ অথবা রতন আবদুল্লাহ আল-হিন্দির নাম উল্লেখ করা যেতে পারে।

তিনি হিন্দ অর্থাত্ ভারত থেকে মদিনায় গিয়ে নূরে মুজাসসাম হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাছে ইসলাম গ্রহণ করে সাহাবা হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন বলে জানা যায়। শুধু তাই নয়, মালাবারের অনুগত চেরদেশের রাজা চেরম নূরে মুজাসসাম হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাছে গিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন বলেও জানা যায়। প্রথম হিজরি শতাব্দী (সপ্তম ঈসায়ী শতাব্দী) ও দ্বিতীয় হি. শতাব্দী (অষ্টম ঈসায়ী শতাব্দী)-তে ব্যবসা ও ইসলাম প্রচারের কাজে এদেশে প্রচুরসংখ্যক আরব, ইরানি ও তুর্কি মুসলমান ও সুফি দরবেশের আবির্ভাব ঘটে। তারা ব্যাপকভাবে এদেশে বসতি স্থাপন করেন। তাদের বংশ বৃদ্ধির মাধ্যমেই পরবর্তীকালে বাংলাদেশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়। সুতরাং এ কথা পরিষ্কারভাবে বলা যায় যে, এদেশের মুসলমানরা সবাই তফসিলি হিন্দু বংশধর নয়। হিন্দুদের মধ্য থেকে যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, তাদেরও অনেকইে ছিলেন রাজ পরিবারের সদস্য।

অন্যদিকে, আরবরা এদেশে এসেছেন ব্যবসায়ী হিসেবে আর সে সময় ব্যবসায়ী অর্থাত্ সাওদাগররা ছিলেন সমাজের শ্রেষ্ঠ সম্মানিত ব্যক্তি। সে যুগের মুসলমান সওদাগররাই বাদশাহ, গভর্নর বা নাযিম হতেন এবং তা হতেন ধনাঢ্য হওয়ার কারণে। আর এ ধন-সম্পদ তারা অর্জন করতেন সাগর-মহাসাগর পাড়ি দিয়ে বিভিন্ন দেশে সাগর ডিঙিয়ে ব্যবসা করে গরিব প্রজাদের থেকে চুষে নেয়া কর বা সুদ দিয়ে নয় (যা ইংরেজ ও তাদের পোষা জমিদাররা এদেশে করেছিল।)

তাই মুসলিম সওদাগরদের সম্পর্কও ছিল সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি ও রাজাদের সাথে। এমনকি আওলিয়ায়ে কিরাম ও সুফি-দরবেশগণেরও ইসলাম প্রচারের কারণে হিন্দু রাজা-মহারাজাদের সাথে সম্পর্ক ও সংঘর্ষ হয়েছে। রাজশাহীর পাহাড়পুরে বৌদ্ধ বিহার থেকে আবিষ্কৃত বাদশাহ হারুনুর রশীদের শাসনকালের (৭৮৬-৮০৯ খ্রি.) মুদা ১ম/৭ম শতাব্দীতে বাংলাদেশে ব্যাপক মুসলিম বসতিরই ইঙ্গিত বহন করে। বস্তুত বাংলাদেশে ইসলামের আবির্ভাব হয় সাহাবা/তাবিয়ী/আরব মুসলিম সওদাগরদের মাধ্যমে আর এর প্রচার-প্রসার হয় সত্যের দিশারী গভীর আধ্যাত্মিক শক্তিসম্পন্ন সুফি-দরবেশগণের মাধ্যমে। আর ব্যবসার কারণে সামুদ্রিক যোগাযোগের মাধ্যমেই তাদের আগমন সহজ হয়েছিল। ৩/৯ম শতাব্দীতে হজরত বায়েজিদ বেস্তামি রহমতুল্লাহি আলাইহি (বিছাল: ২৬০/৮৭২) ও উনার এক বিরাটসংখ্যক অনুসারী সুফির চট্টগ্রাম আগমন এদেশে বহুসংখ্যক মুসলিম দরবেশের আগমন প্রমাণ করে। চট্টগ্রামে উনার স্মারক মাজার আজও স্মৃতি বহন করছে। ৪/১০ম শতাব্দীতে শায়খ আহমাদ বিন মুহাম্মদ (বিছাল: ৩৪৯/৯৫২) এবং শায়ক ইসমাইল বিন নাজান্দ নিশাপুরী (বিছাল: ৩৬৬/৯৭৫) ঢাকায় ইসলাম প্রচার করেন।

৫ম/১১ম শতাব্দীর মধ্যভাগে শায়খ হযরত মীর সুলতান মাহমুদ যিনি সুলতান বলখি নামে পরিচিত, উনার মুর্শিদের নির্দেশে ইসলাম প্রচারের কাজে বাংলাদেশে বগুড়ার মহাস্থানগড় আগমন করেন। উনার অস্বাভাবিক কারামত ও সুন্দর আচরণের মাধ্যমে তিনি এদেশের বহু লোককে ইসলামের মহা সত্যের বায়াত দান করতে সক্ষম হন। ওই একই সময়ে শায়খ হযরত মুহাম্মদ সুলতান রুমী উনার শায়খ ও বেশ কিছুসংখ্যক মুরিদ দিয়ে স্থানীয় রাজ পরিবারের বেশ কিছুসংখ্যক সদস্য ইসলাম গ্রহণ করেন। এরপর ৬/১২ শতাব্দীর প্রথম দিকে শায়খ হযরত বাবা আদম শহীদ উনার সাথীদের সমন্বয়ে ঢাকা জেলার বিক্রমপুরের রাজা বল্লাল সেনের সাথে ইসলামের সত্যের বাণী প্রচারের কারণে যুদ্ধ হয়। এ যুদ্ধে শায়খ বাবা আদম তার সব সাথী সমন্বয়ে মহান আল্লাহর রাহে জীবন দান করে শাহাদাত লাভ করেন। ৭/১৩ শতাব্দীর প্রথম দিকে শায়খ নিয়ামতুল্লাহ বুতশিকান এবং মাখদুম শাহ দৌলা ঢাকা ও পাবনা এলাকায় ইসলাম প্রচার করেন। এ সময় ইখতিয়ারুদ্দীন বখতিয়ার খিলজি বাংলাদেশে মুসলিম রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন

এরপর থেকে এদেশে ৫৬৫ বছরেরও অধিককাল অর্থাত্ ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বাংলাদেশে মুসলিম শাসন বহাল থাকে। এ সময়ে প্রায় ৭৬ জন গভর্নর অথবা সুলতান অথবা নাযিম বাংলা শাসন করেন। এ সময়ের মধ্যে বাংলাদেশে বেশ কিছুসংখ্যক সুফি-দরবেশ ও ওলামায়ে কেরামের আবির্ভাব হয়, যাদের মাধ্যমে এদেশে ইসলাম ও ইসলামী শিক্ষার ব্যাপক প্রচার ও প্রসার হয়। তাদের মধ্যে শায়খ জালালুদ্দীন তাবরিজি (মৃত্যু: ৬৪২/ ১২৪৩) বাংলাদেশে আগমন করেন। তিনি শায়খ আবু সাঈদ ও শায়খ হিশাবুদ্দীন সোহরাওয়ার্দীর খলিফা ছিলেন। ( সংগৃহিত)

সুফিবাদের আগমন এবং ইসলাম সুফিবাদ কি?

$
0
0

সুফিবাদ একটি আধ্যাত্মিক দর্শন। একে তাসাওউফ বলেও অভিহিত করা হয়। এই দর্শনে আত্মা সম্পর্কিত আলোচনা হচ্ছে মুখ্য বিষয়। আত্মার পরিশুদ্ধির মাধ্যমে সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন হলো এই দর্শনের মর্মকথা।

সুফিদের মতে, আত্মার পবিত্রতার মাধ্যমে ফানাফিল্লাহ (আল্লাহর সঙ্গে অবস্থান করা) এবং ফানাফিল্লাহর মাধ্যমে বাকাবিল্লাহ (আল্লাহর সঙ্গে স্থায়িভাবে বিলীন হয়ে যাওয়া) লাভ করা যায়। এই সাধনাকে ‘তরিকত’ বা আল্লাহ-প্রাপ্তির পথ বলা হয়। তরিকত সাধনায় আবার একজন মুর্শিদের প্রয়োজন হয়। সেই পথই হলো ফানাফিল্লাহ। ফানাফিল্লাহ হওয়ার পর বাকাবিল্লাহ লাভ হয়। বাকাবিল্লাহ অর্জিত হলে সুফি দর্শন অনুযায়ী সুফি আল্লাহ প্রদত্ত বিশেষ শক্তিতে শক্তিমান হন এবং অজস্র কারামত প্রদর্শনের অধিকারী হন ।

এই সুফিবাদ উৎকর্ষ লাভ করে পারস্যে। সেখানকার সুফি-দরবেশ এবং কবি-সাহিত্যিকগন তাদের বিভিন্ন কাব্য ও পুস্তক রচনা করে এই দর্শনকে সাধারণের নিকট জনপ্রিয় করে তোলেন। কালক্রমে ওলীদের অবলম্বন করে নানা তরিকা গড়ে ওঠে। সেগুলির মধ্যে চারটি প্রধান তরিকা সর্বাধিক প্রসিদ্ধি লাভ করে:

১) বড় পীর হযরত আব্দুল কাদির জিলানী প্রতিষ্ঠিত কাদেরিয়া তরিকা,
২) খাজা মু’ঈনুদ্দীন চিশতি প্রতিষ্ঠিত চিশতিয়া তরিকা,
৩) খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দী প্রতিষ্ঠিত নকশবন্দিয়া তরিকা এবং
৪) শেখ আহমদ মুজাদ্দিদ-ই-আলফে ছানী সারহিন্দী প্রতিষ্ঠিত মুজাদ্দিদিয়া তরিকা।

এছাড়া সুহ্‌রাওয়ার্দিয়া, মাদারীয়া, আহমদিয়া ও কলন্দরিয়া সহ আরও বেশ কয়েকটি তরিকার উদ্ভব ঘটে।
বাংলায় সুফিবাদঃ

বাংলায় সুফিবাদের আবির্ভাবকাল সঠিকভাবে বলা কঠিন। তবে একাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে সপ্তদশ শতাব্দী পর্যন্ত এদেশে সুফিবাদের সর্বাধিক প্রচার ও প্রসার হয়েছে বলে জানা যায়।আরব, ইয়েমেন, ইরাক, ইরান, মধ্য এশিয়া ও উত্তর ভারত থেকে সুফিরা এসে বঙ্গদেশে সুফিবাদ প্রচার করেন। তাদের মৃত্যুর পর কিছু অতিভক্তগন কর্তৃক প্রচলিত হয়ে যায় যে তারা বিভিন্ন অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন, লিখা হয় বিভিন্ন গাঁজাখুরি কিচ্ছা কাহিনি যা ইসলামের সাথে সরাসরি বিরোধ করে ও তারা নাকি আমাদের প্রিয় রাসুল (সাঃ) এবং সাহাবাদের (রাঃ) থেকেও বেশি অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন, এই সব কথা লিখা হয়েছে তাদের বই গুলোতে এবং তাতে স্পষ্ট শিরক ও কুফর লক্ষ্য করা যায়।

সুফিদের চালচলন, মানবপ্রেমের ইত্যাদির কারণে এদেশের সাধারণ কিছু মানুষ সুফিবাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ওঠে । এভাবে ক্রমশ বঙ্গদেশে সুফিবাদ প্রসার লাভ করে। ১২০৪-৫ খ্রিস্টাব্দে বখতিয়ার খলজী কর্তৃক বাংলাদেশ বিজিত হলে ইসলামের শরীআত ও মারিফত উভয় ধারার প্রচার ও প্রসার তীব্রতর হয়। শাসকশ্রেণীর সঙ্গে বহু পীর-দরবেশ এদেশে আগমন করে নিজস্ব তরীকায় ইসলাম প্রচারে মনোনিবেশ করেন। এরা নিজ রচিত সুফিবাদের আধ্যাত্মিক তত্ত্ব চমৎকারভাবে তুলে ধরে সাধারণ কিছু মূর্খ মানুষকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেন, ফলে বঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে এই মতবাদ প্রসার লাভ করে। সুফিগণ নিজেদের রচিত বিভিন্ন তরীকা এবং মানুষের মাঝে প্রেম-ভ্রাতৃত্ব-সাম্যের মধুর বাণী প্রচার করে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এদেশের কিছু সাধারণ মানুষের মন জয় করতে সক্ষম হন ।
তাদের মধ্যে কেউ কেউ লোকমুখে কিংবদন্তি-পুরুষে পরিণত হয়েছেন। এদের অনেকের মাযার তৈরি হয়েছে, যেগুলোকে পবিত্র ও পুণ্য স্থান বিবেচনা করা হয় । এমন কি কেউ কেউ নিয়মিত যিয়ারত করে ও পার্থিব কামনা-বাসনায় মানত করে, মাজারে টাকা পয়সা, ফুল , মোমবাতি , আগরবাতি ইত্যাদি দেয়াকে ছওয়াব মনে করে ! এই সুফিবাদ দ্বারা পরবর্তীতে বৈষ্ণবধর্ম, লৌকিক মরমিবাদ, বাউল ধর্মমত ও অন্যান্য ভক্তিবাদও কমবেশি প্রভাবিত হয়।

কিছু সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনেও সুফিদের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। যেমন নদী ও সমুদ্রপথে যাতায়াতের সময় কিছু মাঝিরা বদর পীরের নাম স্মরণ করে। শুধু তাই নয়, নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছানোর উদ্দেশ্যে শহরের কিছু যানবাহনে পর্যন্ত বিভিন্ন পীর-আউলিয়ার নাম লেখা থাকে। লৌকিক ধারার মুর্শিদি-মারফতি গান, গাজীর গান , গাজীকালু-চম্পাবতী কাব্য ও অন্যান্য মরমীসাহিত্য, মাদার পীর ও সোনা পীরের মাগনের গান ইত্যাদি বিভিন্ন পীর-দরবেশকে কেন্দ্র করে রচিত। এভাবে বাংলায় কিছু মানুষের ধর্মীয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও বৈষয়িক জীবনের নানা ক্ষেত্রে সুফিবাদের প্রভাব দেখা যায় । কিন্তু এই সুফিবাদের সাথে না আছে কোরআনের কোন সম্পর্ক, না আছে হযরত রাসুলে কারিম (স) এর ৬৩ বছরের জীবনযাত্রার সম্পর্ক, আর না আছে নবীর অনুসারীদের জীবনযাত্রার সম্পর্ক ।
পরিশেষে অল্প কিছু কথা :

মুলত একটি বিষয় আমাদের মনে রাখতে হবে, এই দেশে ইসলামের দাওয়াত প্রথমেই আল্লাহর কিতাব থেকে হইনি, হয়েছে সুফি দরবেশদের আমল-আখলাক, বেশ-ভুষা, সুন্দর ব্যাবহার, মাধুর্যমণ্ডিত কাব্য-কথা ইত্যাদির মাধ্যমে । সুতরাং, এইসব বাহ্যিক দিক গুলোয় আকৃষ্ট ও প্রভাবিত হয়ে সাধারণ কিছু মানুষ ক্রমান্বয়ে সুফিবাদে বিশ্বাসী ও ভক্ত হয়ে ওঠে এবং সেটা অন্ধ বিশ্বাসে রুপান্তরিত হয়। এরা বিভিন্ন তরীকায় বিভক্ত হয়ে পড়ে এবং আল কোরআনের শিক্ষা তাদের কাছে গৌণ হয়ে যায় । তাই এসব থেকে মুক্তির একমাত্র পথ কোরআন আঁকড়ে ধরা এবং রাসুল (স) এর কোরআন বাস্তবায়ন পদ্ধতি দ্বারা জীবনকে ঢেলে সাজানো । এছাড়া অন্যান্য তরীকায় চললে কিয়ামতের মাঠে মুক্তি কখনই মিলবেনা ।

আল্লাহ্‌ বলেন “আর আমি অবতীর্ণ করেছি তোমার উপর এমন গ্রন্থ যেখানে রয়েছে সকল বস্তুর বিস্তারিত বর্ণনা বা জ্ঞান।” (সূরা আননাহল-৮৯)

“তোমরা আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য কর যাতে তোমরা কৃপা লাভ করতে পার” (সুরা আলে ইমরান- ১৩২)

“হে মুমিনগণ! রাসূল যখন তোমাদের এমন কিছুর দিকে আহবান করে যা তোমাদের প্রানবন্ত করে, তখন আল্লাহ ও রাসূলের আহবানে সাড়া দিবে।” (সুরা আনফাল- ২৪)

আসুন, আমরা সচেতন হই এবং মুরুব্বী ও সাধকগনদের অধিক সম্মান ও ভক্তি দেখাতে গিয়ে যেন শিরক না করে বসি ।