বিভিন্ন সময়ে শত শত সূফী দরবেশগণ ও তাদের অনুগামী শিষ্যরা ভারত উপমহাদেশে আগমন করেন। এবং বিভিন্ন শহর ও গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েন ইসলাম প্রচারের জন্য। মুসলমানদের মানসিক ও নৈতিক উন্নতি উৎকর্ষ বিধানে সুফিদের কৃতিত্ব ছিল মুসলিম সেনাপতি বিজেতা ও শাসকবর্গ অপেক্ষা অনেক বেশি স্থায়ী ও কার্যকর। তাদের ধর্মীয় অনুরাগ ধর্ম প্রচারের আগ্রহ মানব হিতৈষীমূলক কার্যাবলী ছাড়াও জনমানসকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেন এবং ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করেন।
ইসলামের প্রথম যুগে আবর মুসলমানদের মধ্যে সুফিদের উৎপত্তি ঘটলেও পারস্যেই এর মূল প্রসার ঘটেছিল। এরপর ধীরে ধীরে সুফিরা বিভিন্ন সময়ে ভারত বর্ষে এসে বিভিন্ন তরিকার মাধ্যমে তাঁদের মরমী কার্যাবলী প্রচার করেন।
সুফিবাদ পরিচিতিঃ
পরম সত্তাকে জানার জন্য অনন্তকাল ধরে মানুষের মধ্যে রয়েছে এক অদম্য আকাঙ্খা। তাই মানুষ যুগে যুগে আধ্যাত্মিক অভিযান চালিয়েছে। এ পরম সত্তাকে আবিষ্কার করে তাঁর সাথে নিবিড় সম্পর্ক স্থাপন করতে, পরম সত্তাকে জানার এ প্রয়াসকে ইসলামে বলা হয় সুফিবাদ। সুফিবাদ হচ্ছে ইসলামী এমন একটি পথ যে পথে কঠোর ধ্যান ও প্রার্থনার মাধ্যমে স্রষ্টার ভালবাসা পাওয়া যায় এবং সাথে নিজের আত্মার উন্নয়ন। স্রষ্টার প্রতি তীব্র ভালবাসার মাধ্যমে মানুষের আত্মোন্নয়নই হচ্ছে সুফিবাদের মূল কথা। ঈশ্বর সত্তার সঙ্গে নিজেকে লীন করে দেয়ার মধ্যেই সুফিবাদের পরম পাওয়া।
অধ্যাপক ম্যাসিগনোঁ বলেন, সুফিবাদ বা মরমীবাদী আন্দোলন এসেছে আদিম মুসলমানদের অতিরিক্ত কঠোর সংযমের প্রত্যক্ষ উত্তরাধিকার সুত্র। আবার আদিম আরবী এবং পার্সিয়ান উৎস হতে জানা যায় যে, সুফিবাদ হল জীবনের একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য যা নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর পরপরেই এটি প্রসারিত বা বিস্তৃত না হয়ে খুবই ধীরে ধীরে বিস্তৃতি লাভ করে। ইসলামের চতুর্থ খলিফা হযরত আলী (রাঃ) এর খেলাফতের অবসানের পরে সুফিবাদ প্রকাশিত হয়। এ সময় শাসকদের মধ্যে যুদ্ধ-বিগ্রহ থাকায় কিছু উলেমা, নবী ও খলিফাদের আদর্শ নিয়ে এই পথ চলে আসে।
সুফি শব্দের উৎসঃ ‘সুফি’ নামটি সাধারণত ইসলামের মরমীবাদী ও সাধু পুরুষদের নামের সঙ্গে জড়িত। সুফি শব্দটির উৎপত্তি নিয়ে পন্ডিতদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। এ সম্পর্কে প্রধানত ৫টি মত রয়েছে।
১. ‘সুফি’ শব্দটি আরবী সুফা শব্দ থেকে এসেছে। সফ অর্থ কাতার বা সারি। এ মতের অনুসারীরা বলে থাকেন যে, সুফিগণ মুসলিম বিশ্বের প্রথম সফ বা সারির লোক বিধায় তাদেরকে সুফি নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে। তাছাড়া কিয়ামতের দিনে মানুষ তাদের বিশ্বাস কার্যানুযায়ী বিভিন্ন কাতার বন্দী বা অগ্রবর্তীদের দলভূক্ত হবেন। সুফি পদটি তাঁদের এরূপ মর্যাদার নির্দেশক।
২. কারো কারো মতে ‘সুফি’ শব্দটি ‘আহলে সুফফা’ থেকে এসেছে। মহানবী (সাঃ) এর সময়ে মদীনায় আহলে সুফফার প্রায় ৫০০ সাহাবী ছিলেন যাদের কোন পার্থিব আকর্ষণ বা উৎসাহ ছিল না। তাদের জীবন যাপনের সাথে সুফিদের জীবনের যথেষ্ট মিল রয়েছে।
৩. কারো কারো মতে, সুফিরা ‘সুফ’ নামে এক প্রকার রঙ্গীন পোশাক পশমের পোশাক পরিধান করতেন বলে এটি তাদের পরিচয় সূচক নাম।
৪. কোন কোন পন্ডিতের আরবী ‘সাফা’ অর্থ পবিত্রীকরণ তাঁদের মতে, সুফিরা ছিলেন পবিত্র চরিত্রের অধিকারী এবং তারা পবিত্র এর উপর জোর দিতেন বেশি।
৫. অধ্যাপক নিকলসন সহ কিছু সংখ্যক পাশ্চাত্য পন্ডিত মনে করেন -‘সুফি’ শব্দটি গ্রীক সার্কোস শব্দ থেকে এসেছে। যার অর্থ জ্ঞানের প্রতি অনুরাগ ছিলেন।
যাহোক আধুনিক পন্ডিতদের গ্রহণযোগ্য মত এই যে, ‘সুফ’ শব্দই সুফি বা তাসাউফের মুল।
প্রথম সুফি নামধারী :
সুফি শব্দটি খ্রীস্টীয় অষ্টম শতকের দ্বিতীয়ার্ধে কুফার জারির বিন হাইয়ান নামক একজন রাসায়নিক পেশাধারী সাধক এবং আবু হাশিম নামক একজন সাধকের নামে সর্বপ্রথম ব্যবহৃত হয়।
প্রাথমিক যুগের সুফিঃ যদিও প্রাথমিক যুগে সুফিবাদ ভালভাবে সংগঠিত হতে পারে নি, কিন্তু তাদের কিছু অবদান লক্ষ্য করা যায়। প্রাথমিক যুগের কয়েকজন সুফিরা হলেন – বসরার হাসান প্রাথমিক যুগের সুফি বলে পরিচিত। তার মন ধ্যান ধারণায় আল্লাহর ভয় ছিল এবং জীবনে কখনো পাপ কাজ করার উদ্রেক দেখা যায় নি।
কুফার সুফি আবু হাশেমকে ধরা হয় তিনিই প্রথম মরমী এবং ঐ সময় থেকে সুফি নাম ব্যবহার করা হয়। তিনি বিশ্বাস করতেন সুফিদের মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ গুণ হচ্ছে আত্মশুদ্ধি।
ইব্রাহিম বিন আদহম ছিলেন বলখ এর রাজা, যিনি তার অধিকারভূক্ত সিংহাসন ছেড়ে সন্ন্যাস জীবন গ্রহণ করেন।
বসরার রাবিয়া ছিলেন প্রথম মহিলা সুফি সাধক। যিনি ধার্মিক জীবন পালন করতেন এবং দাসের মত খুবই পরিশ্রমী ছিলেন। তিনি বলতেন আল্লাহর প্রেম আমাকে এত বেশি নিমগ্ন করেছে যে, আর কারো কোন প্রেম বা ঘৃণাই আমার অন্তরে নেই।
বায়েজিদ বোস্তামি তার “Pure love by denying one’s own self.”ধারণার জন্য বিখ্যাত। প্রাথমিক পর্যায়ের সুফিবাদ আল্লাহর ভীতি ও শেষ বিচারের দিনের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। কিন্তু কালক্রমে এই ধারণার পরিবর্তন আসে এবং প্রেমের মধ্য দিয়ে প্রিয়তম আল্লাহর সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের ভিত্তিরূপে পরিগণিত হয়। দশম শতক থেকে সুফিবাদ মূলস্থান থেকে সরে আসতে থাকে সর্বেশ্বরবাদের দিকে।
ভারতবর্ষে বিভিন্ন সুফি তরিকাঃ
সুফি সাধনার অনুসৃত পথ বা পদ্ধতিকেই তরিকা বলা হয়। প্রতিটি তরিকাই এক বা একাধিক বিশিষ্ট সুফি নির্দেশিত সাধন পদ্ধতি ধারণ করে আছে। খ্রীস্ট দশম শতাব্দীতে সুফিদের সাধন পদ্ধতি অর্থাৎ আধ্যাত্মিক অনুশীলনকে নিয়ন্ত্রিত করার জন্যে বিভিন্ন তরিকার উদ্ভব ঘটে। এই সব তরিকার প্রতিষ্ঠাতা কোন সুফি সাধকগণ হলেও মূলত সব তরিকাই শেষ পর্যন্ত কোন তাবেয়ী বা সাহাবীর মাধ্যমে মহানবী (সাঃ) এর সাথে যুক্ত হয়েছে। সুফি সাধনার জগতে অসংখ্য তরিকা রয়েছে। পুরাতন-নতুন মিলে বর্তমানে সাধনার জগতে প্রায় ২০০ এর অধিক তরিকা রয়েছে। এগুলোর মধ্যে নিম্নোক্ত তরিকাগুলো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
চিশতিয়া তরিকাঃ
ভারতে দীক্ষিত সংঘের মধ্যে সবচেয়ে পুরাতন হল চিশতিয়া তরিকা। এর প্রতিষ্ঠাতা নিয়ে মতবিরোধ আছে। কারো মতে, হযরত আলীর নবম অধ:স্তন পুরুষ আবু ইসহাক এই তরিকার প্রতিষ্ঠাতা। আবার কারো মতে, খাজা আবদাল চিশতি এই তরিকার প্রতিষ্ঠাতা। খাজা মুঈন-উদ্দিন চিশতী চিশতিয়া তরিকাকে ভারত উপমহাদেশে আনয়ন করেন। তিনি পাক-ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সুফিরূপে প্রসিদ্ধি লাভ করেন এবং আফতাব-ই-মূলক হিন্দি অর্থাৎ হিন্দুস্তানের সূর্য উপাধিতে ভূষিত হন। তিনি ১১৪২ খ্রী. সিসতানে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বিখ্যাত সুফিদের সান্নিধ্য লাভ করেন। ১১৯২ সালে মু. ঘুরী দিল্লি অধিাকর করলে ১১৯৩তে খাজা মুঈন-উদ্দিন ভারতে আসেন এবং আজমীরে গিয়ে খানকাহ স্থাপন করে ইসলাম প্রচারের ব্রতী হন। বাকী জীবন এখানে কাটিয়েছেন। তার মৃত্যুর পর আজমীরে তার দরগাহ তীর্থক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।
বাংলা-পাক-ভারতে চিশতিয়া তরীকা অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠে। তাঁর প্রধান খলিফা ছিলেন খাজা কুতব উদ্দিন বখতিয়ার কাকী; যিনি দিল্লিতে বসবাস করতেন এবং ইলতুৎমিশ তাকে খুব শ্রদ্ধা করতেন কুতব মিনারের কাছে তাকে সমাহিত করা হয় এবং এটি তীর্থকেন্দ্রে পরিণত হয়। দিল্লির পরবর্তী বিখ্যাত চিশতি সুফি হলেন শেখ নিজাম উদ্দিন আউলিয়া, তাঁর খানকাও তীর্থকেন্দ্রে পরিণত হয়। তাঁর প্রধান শিষ্য ছিলেন শেখআঁখি সিরাজ যিনি বাংলাদেশে চিশতিয়া তরিকা জনপ্রিয় করে তোলেন।
প্রকৃতি :
চিশতিয়া তরিকার ‘ইল্লাল্লাহ’ শব্দ জপ করার উপর বিশেষ জোর দিতেন। তাঁরা উপাসনার সময় সমাগম করতেন এবং রঙ্গিন বস্ত্র পরিধান করতেন, কেউ মুরীদ হতে গেলে তাকে প্রথমে দুই রাকাত নামাজ পড়তে হয় এবং বিভিন্ন বিষয়ে উপদেশ দেওয়া হয়। অতঃপর মুরীদকে কতগুলো আল্লাহর নাম শিখানো হয় এবং কোন দরগায় গিয়ে ৪০ দিন সিয়াম পালনের আদেশ দেওয়া হয়। অবশেষে তাকে তরিকার পরিচয় দেওয়া হয়। আফিং, ভাঙ্গঁ, তামাক, মাদকদ্রব্য ইত্যাদি চিশতিয়া সুফিদের জন্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। মোঘল যুগে এই তরিকার দরবেশদের মধ্যে অন্য্যতম ছিলেন শেখ সেলিম, এরপর চিশতিয়া তরিকা কয়েকটি উপভাগে ভাগ হয়।
সোহরাওয়ার্দী তরীকাঃ
শেখ নজিব উদ্দিন আব্দুল কাদির এই তরিকার প্রতিষ্ঠাতা। তিনি নিজামিয়া কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন এবং হাদিস শাস্ত্রো বিশেষভাবে বুৎপন্ন ছিলেন। তাঁর পরে তার ভ্রাতুষ্পুত্র শাহাব উদ্দিন উমর বিন আব্দুল্লাহ এই তরিকার প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা বলেন। সোহরাওয়ার্দী তরিকা ভারতে বিস্তার লাভ করে শেখ বাহাউদ্দিন জাকারিয়ার হাত ধরে ১২৬৭ সালে। তিনি পিতার মৃত্যুর পর খোরসনে শিক্ষাগ্রহণের পর পন্ডিত হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। এরপর তিনি মক্কায় মুহাম্মদ (সাঃ) এর কবরের সেবক হিসেবে ৫৩ বছর অবস্থান করেন। পরে তিনি শাহাব উদ্দিনের কাছ থেকে দীক্ষা লাভ করেন।
শায়খ শিহাব উদ্দিন ভারতে সুফি তরিকা প্রচারের জন্য দায়িত্ব অর্পন করেন শায়খ বাহাউদ্দিনের উপর। তিনি এ দায়িত্ব শুধু মুলতানে প্রচার করেন নি বরং পাশ্ববর্তী বেলূচিস্তানসহ অন্যত্র পৌছিয়েছেন। ইলতুৎমিশ তাঁকে শেখ উল-ইসলাম উপাধিতে ভূষিত করেন। শেখ শাহাব উদ্দিনের আরেকজন শিষ্য শেখ জালাল উদ্দীন তাবরেজী মুলতান ও দিল্লির মধ্য দিয়ে বাংলায় এসে এই তরিকার প্রচার কার্য চালিয়ে যান।
শাত তারিয়া তরিকাঃ
ভারতে এই তরিকা প্রচার করেন সৌদি সুলতানদের আমলে শেখ সিরাজ উদ্দিন আব্দুল্লাহ শাত্তারী। শাত্তার শব্দের অর্থ ভ্রমন করা। আর সুফি মতের ভাষায় ইলম শাত্তারিয়া অর্থ আত্মার সঞ্চালন ও উচ্চাকাঙ্খা বুঝায়। মোঘল সম্রাট হুমায়ুন শাত্তারিয়া তরিকা গ্রহণ করেন সৈয়দ মুহাম্মদ গাউছের কাছ থেকে। আবুল ফজলের “আইন-ই-আকবরী” গ্রন্থে এই তরিকার উল্লেখ আছে। জৌনপুর ও বিহারে এই তরিকার সুফিদের বেশ প্রভাব ছিল। সিরাজ উদ্দিন আব্দুল্লাহর প্রধান শিষ্য ছিলেন শায়খ ওয়াজী উদ্দিন গুজরাটি। তাঁর সমাধি আহমেদাবাদে অবস্থিত যেখানে নুরজাহান কর্তৃক শাহ পীরের মাজার নির্মিত হয়েছে। এই তরিকার সুফিরা তাওহীদের উপর বিশেষরূপে জোর দিতেন এই জন্য তাঁরা ‘ফনা’ বা ফনা ফিল ফনা বিশ্বাস করতেন না, কেননা ফনা তাওহীদের বিপরীত।
কাদেরীয়া তরিকাঃ
হযরত মুহীউদ্দিন আব্দুল কাদের জিলানী এই তরিকার প্রতিষ্ঠাতা। তিনি ১০৭৭-৭৮ সালে জিলান জেলায় জন্মগ্রহণ করেন এবং ১১৬৬ সালে বাগদাদে পরলোকগমন করেন। এই তরিকা ভারতে ব্যাপক জনপ্রিয় ও প্রভাবিত হয়ে উঠে। কাদেরিয়া তরিকা হযরত আব্দুল্লা কাদেরের জীবদ্দশাতেই বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠে এবং তার মৃত্যুর পর তাঁর শিষ্যরা এই তরিকা সারা মুসলিম জাহানে বিস্তার করে। বিভিন্ন স্থানে এই তরিকার সুফিরা বিভিন্ন জিনিসকে তাঁদের তরীকার প্রতীকরূপে ব্যবহার করেন। যেমন- তুরস্কের মুসলমানরা সবুজ গোলাপ ফুলকে প্রতীকরূপে গ্রহণ করেন এবং পাক-বাংলা-ভারতে তাঁর জন্মদিনে উৎসব পালন করা হয়।
প্রকৃতিঃ
হযরত আব্দুল কাদের রচিত “ফুয়ুদত-আল-রব্বানীয়া” গ্রন্থে দেখা যায় যে, কোন লোক কাদেরীয়া তরিকা গ্রহণ করতে চাইলে তাঁকে দিনে সিয়াম পালনে এবং রাত্রে আল্লাহর উপাসনায় মশগুল থাকতে আদেশ দেওয়া আছে। এই অবস্থায় তাকে ৪০ দিন থাকতে হয়। পরবর্তীতে এই তরিকা বানাগাজী মু. গাউস প্রচার করেন। এই তরিকার প্রমাণ বহন করে “শাখিনতে উল আউলিয়া মায়ানমির” এর সমাধি কমপ্লেঙ্। এই তরিকা কোরআন ও হাদিস অনুযায়ী পারিবারিক জীবন পরিচালনা করতে উৎসাহী করে তোলে।
নকশবন্দীয়া তরিকাঃ
এই তরিকার প্রতিষ্ঠাতা হলেন তুর্কিস্তানের মু. বিন মুহাম্মদ বাহাউদ্দিন আল বোখারী (১৩১৭ – ১৩৮৯ খ্রী.পু.)। নকশবন্দ শব্দের অর্থ চিত্রকর। এই তরিকার সুফীরা আল্লাহর মহিমার চিত্র হৃদয়ে ধারণ করতেন বলে তাদেরকে নকশবন্দীরা বলা হত। ভারতে এর প্রচারক হলেন খাওয়াজ মু. বাকী বিল্লাহ যার সমাধি দিল্লিতে অবস্থিত। এরপর এই তরিকার প্রচারক ছিলেন শায়খ আহমেদ ফারুকী শবহিন্দী। সম্রাট জাহাঙ্গীরও তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন এই তরিকা অনেক পূর্বে প্রতিষ্ঠিত হলেও ভারতে অনেক পরে প্রবেশ করে। এছাড়াও ভারত উপমহাদেশের প্রধান প্রধান তরিকাগুলোকে কেন্দ্র করে কিছু সংখ্যক উপতরিকা পাওয়া যায়।
বাংলায় সুফিবাদ ও সুফি আগমনের প্রেক্ষাপটঃ
ইসলাম অধ্যুষিত পশ্চিম ও মধ্য এশিয়া এবং উত্তর-ভারত থেকে বিভিন্ন সময়ে শত শত সুফি দরবেশ বাংলাদেশে আগমন করেন। তারা নানা তরীকার বিশেষ করে চিশতিয়া ও সোহরাওয়ার্দীয়া সম্প্রদায়ের অন্তর্ভূক্ত ছিলেন। বর্হিদেশ থেকে আমদানীকৃত হলেও, বাংলাদেশ সুফিবাদ বিস্তারের উপযুক্ত ক্ষেত্র হিসেবে প্রমাণিত হয়। সুফিবাদ সমগ্র বাংলাদেশ এমনকি সূদুর গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে, ফলে খানকাহ ও দরগাহ দেশের আনাচে কানাচে পর্যন্ত গড়ে উঠেছিল। বাংলার মাটিতে সুফিবাদ এত বেশি প্রসার লাভ করে যে, কয়েকজন বিখ্যাত বাঙ্গালী সুফির শিক্ষার ভিত্তিতে এখানে কয়েকটি নতুন মরমী সম্প্রদায়ের বিকাশ হয়।
বাংলায় সুফি আগমনকে ঐতিহানিকরা তিনটি পর্যায়ে ভাগ করেছেন। যেমন-
১. মুসলিম রাজশক্তি প্রতিষ্ঠার পূর্বে (৭ম – ৮ম শতকে) বণিকদের মাধ্যমে।
২. মিশনারী ভূমিকায় সুফি আগমন (এগারো শতক থেকে)।
৩. মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার পর থেকে (তের শতক থেকে)।
বাংলায় সুফি আগমন এবং তাঁদের কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে বাংলার মানুষের নিকট তাঁরা খুব সহজে জনপ্রিয় হয়ে উঠেন যার পিছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ পেক্ষাপট রয়েছে।
রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায় মধ্যযুগ হল বাংলার মুসলিম শাসনের ইতিহাস, বাংলায় ইসলামের আবির্ভাব, প্রতিষ্ঠা এবং দীর্ঘদিন টিকে থাকার কারণে ধীরে ধীরে বাংলার সমাজ সংস্কৃতি ও সভ্যতায় এক বিরাট পরিবর্তন আসে। মুসলমান সুফি, সাধক ও শাসক শ্রেণীর ঔদার্যে এদেশের সনাতন সাংস্কৃতিক চেতনায় মুসিলম ধ্যান-ধারণা জায়গা করে নেয়। ইসলাম ধর্মের প্রচারক হিসেবে সুফি দরবেশগণ তাদের উদার মানসিকতার কারণে এদেশের মানুষের মনে বিশেষ স্থান লাভ করেন।
প্রাচীনকাল থেকে বাংলায় আর্থ-সামাজিক ও সংস্কৃতির বিভিন্ন দিক বিচারে চতুবর্ণের (ব্রাক্ষণ, কায়স্থ, বৈশ্য, শুদ্র) বিকাশ ঘটে, যার চূড়ান্ত ও নির্মম পরিণতি পরিলক্ষিত হয় সেন শাসনামলে, বল্লাল সেন কৌলিন্য প্রথা প্রবর্তন করায় সমাজে স্বীকৃতি ছিল না নিম্ন শ্রেণীর মানুষদের। সেই সাথে সামন্তবাদের প্রভাবে অর্থনৈকি অবস্থাও হীন থেকে হীনতর হয়ে উঠে। সাধারণ মানুষের চোখে প্রশাসন ছিল ভীতি এবং সামাজিক বৈষম্য ছিল অমানবিক অত্যাচারের মত। শুধুমাত্র সামাজিক বিধান আরোপের মাধ্যমে নয় বরং প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপের মাধ্যমে জনসাধারণের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছিল। এই বৈষম্যমূলক সমাজ বিধান ও হিংসাত্মক আচরণ অবহেলিত শ্রেণীকে বিক্ষুব্ধ করে তুলেছিল এবং লক্ষণ সেনের স্বৈরাচারী মনোভাব এর কারণে রাজসভার আমত্যরাও বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল। এই জ্ঞাতি বিদ্বেষ এবং সামাজিক বৈষম্য ও বিশৃঙ্খলা ইসলাম প্রচারের জন্য একটি উপযোগী ও অনুকূল পটভূমি প্রস্তুত করে।
ভারতবর্ষে ইসলাম প্রচারের দুটো পদ্ধতি ছিল।
(১) তুর্কিয়ানা তরীকা (২) সুফিয়ানা তরিকা।
বাংলায় ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে সুফিয়ানা তরিকা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, কেননা সুফিদের মানবিকতার আবেদন, ব্যক্তিত্ব ও অলৌকিক ক্ষমতায় সাধারণ মানুষের মধ্যে শ্রদ্ধা ও অনুরক্তির জন্ম হয়েছে। তাদের জীবন যাত্রার সরলতা ও সাম্যের বাণী তৎকালীন সাধারণ মানুষের বিশেষ করে ধর্মীয় ও সামাজচ্যুতদের ইসলামের সাম্যবাণী বয়ে আনা সুফিবাদ উৎসাহের কারন হয়ে উঠে
সুফিদের মতে, আত্মার পবিত্রতার মাধ্যমে ফানাফিল্লাহ (আল্লাহর সঙ্গে অবস্থান করা) এবং ফানাফিল্লাহর মাধ্যমে বাকাবিল্লাহ (আল্লাহর সঙ্গে স্থায়িভাবে বিলীন হয়ে যাওয়া) লাভ করা যায়। এই সাধনাকে ‘তরিকত’ বা আল্লাহ-প্রাপ্তির পথ বলা হয়। তরিকত সাধনায় আবার একজন মুর্শিদের প্রয়োজন হয়। সেই পথই হলো ফানাফিল্লাহ। ফানাফিল্লাহ হওয়ার পর বাকাবিল্লাহ লাভ হয়। বাকাবিল্লাহ অর্জিত হলে সুফি দর্শন অনুযায়ী সুফি আল্লাহ প্রদত্ত বিশেষ শক্তিতে শক্তিমান হন এবং অজস্র কারামত প্রদর্শনের অধিকারী হন ।
এই সুফিবাদ উৎকর্ষ লাভ করে পারস্যে। সেখানকার সুফি-দরবেশ এবং কবি-সাহিত্যিকগন তাদের বিভিন্ন কাব্য ও পুস্তক রচনা করে এই দর্শনকে সাধারণের নিকট জনপ্রিয় করে তোলেন। কালক্রমে ওলীদের অবলম্বন করে নানা তরিকা গড়ে ওঠে। সেগুলির মধ্যে চারটি প্রধান তরিকা সর্বাধিক প্রসিদ্ধি লাভ করে:
১) বড় পীর হযরত আব্দুল কাদির জিলানী প্রতিষ্ঠিত কাদেরিয়া তরিকা,
২) খাজা মু’ঈনুদ্দীন চিশতি প্রতিষ্ঠিত চিশতিয়া তরিকা,
৩) খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দী প্রতিষ্ঠিত নকশবন্দিয়া তরিকা এবং
৪) শেখ আহমদ মুজাদ্দিদ-ই-আলফে ছানী সারহিন্দী প্রতিষ্ঠিত মুজাদ্দিদিয়া তরিকা।
এছাড়া সুহ্রাওয়ার্দিয়া, মাদারীয়া, আহমদিয়া ও কলন্দরিয়া সহ আরও বেশ কয়েকটি তরিকার উদ্ভব ঘটে।
বাংলায় সুফিবাদঃ
বাংলায় সুফিবাদের আবির্ভাবকাল সঠিকভাবে বলা কঠিন। তবে একাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে সপ্তদশ শতাব্দী পর্যন্ত এদেশে সুফিবাদের সর্বাধিক প্রচার ও প্রসার হয়েছে বলে জানা যায়।আরব, ইয়েমেন, ইরাক, ইরান, মধ্য এশিয়া ও উত্তর ভারত থেকে সুফিরা এসে বঙ্গদেশে সুফিবাদ প্রচার করেন। তাদের মৃত্যুর পর কিছু অতিভক্তগন কর্তৃক প্রচলিত হয়ে যায় যে তারা বিভিন্ন অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন, লিখা হয় বিভিন্ন গাঁজাখুরি কিচ্ছা কাহিনি যা ইসলামের সাথে সরাসরি বিরোধ করে ও তারা নাকি আমাদের প্রিয় রাসুল (সাঃ) এবং সাহাবাদের (রাঃ) থেকেও বেশি অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন, এই সব কথা লিখা হয়েছে তাদের বই গুলোতে এবং তাতে স্পষ্ট শিরক ও কুফর লক্ষ্য করা যায়।
সুফিদের চালচলন, মানবপ্রেমের ইত্যাদির কারণে এদেশের সাধারণ কিছু মানুষ সুফিবাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ওঠে । এভাবে ক্রমশ বঙ্গদেশে সুফিবাদ প্রসার লাভ করে। ১২০৪-৫ খ্রিস্টাব্দে বখতিয়ার খলজী কর্তৃক বাংলাদেশ বিজিত হলে ইসলামের শরীআত ও মারিফত উভয় ধারার প্রচার ও প্রসার তীব্রতর হয়। শাসকশ্রেণীর সঙ্গে বহু পীর-দরবেশ এদেশে আগমন করে নিজস্ব তরীকায় ইসলাম প্রচারে মনোনিবেশ করেন। এরা নিজ রচিত সুফিবাদের আধ্যাত্মিক তত্ত্ব চমৎকারভাবে তুলে ধরে সাধারণ কিছু মূর্খ মানুষকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেন, ফলে বঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে এই মতবাদ প্রসার লাভ করে। সুফিগণ নিজেদের রচিত বিভিন্ন তরীকা এবং মানুষের মাঝে প্রেম-ভ্রাতৃত্ব-সাম্যের মধুর বাণী প্রচার করে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এদেশের কিছু সাধারণ মানুষের মন জয় করতে সক্ষম হন ।
তাদের মধ্যে কেউ কেউ লোকমুখে কিংবদন্তি-পুরুষে পরিণত হয়েছেন। এদের অনেকের মাযার তৈরি হয়েছে, যেগুলোকে পবিত্র ও পুণ্য স্থান বিবেচনা করা হয় । এমন কি কেউ কেউ নিয়মিত যিয়ারত করে ও পার্থিব কামনা-বাসনায় মানত করে, মাজারে টাকা পয়সা, ফুল , মোমবাতি , আগরবাতি ইত্যাদি দেয়াকে ছওয়াব মনে করে ! এই সুফিবাদ দ্বারা পরবর্তীতে বৈষ্ণবধর্ম, লৌকিক মরমিবাদ, বাউল ধর্মমত ও অন্যান্য ভক্তিবাদও কমবেশি প্রভাবিত হয়।
কিছু সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনেও সুফিদের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। যেমন নদী ও সমুদ্রপথে যাতায়াতের সময় কিছু মাঝিরা বদর পীরের নাম স্মরণ করে। শুধু তাই নয়, নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছানোর উদ্দেশ্যে শহরের কিছু যানবাহনে পর্যন্ত বিভিন্ন পীর-আউলিয়ার নাম লেখা থাকে। লৌকিক ধারার মুর্শিদি-মারফতি গান, গাজীর গান , গাজীকালু-চম্পাবতী কাব্য ও অন্যান্য মরমীসাহিত্য, মাদার পীর ও সোনা পীরের মাগনের গান ইত্যাদি বিভিন্ন পীর-দরবেশকে কেন্দ্র করে রচিত। এভাবে বাংলায় কিছু মানুষের ধর্মীয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও বৈষয়িক জীবনের নানা ক্ষেত্রে সুফিবাদের প্রভাব দেখা যায় । কিন্তু এই সুফিবাদের সাথে না আছে কোরআনের কোন সম্পর্ক, না আছে হযরত রাসুলে কারিম (স) এর ৬৩ বছরের জীবনযাত্রার সম্পর্ক, আর না আছে নবীর অনুসারীদের জীবনযাত্রার সম্পর্ক ।
পরিশেষে অল্প কিছু কথা :
মুলত একটি বিষয় আমাদের মনে রাখতে হবে, এই দেশে ইসলামের দাওয়াত প্রথমেই আল্লাহর কিতাব থেকে হইনি, হয়েছে সুফি দরবেশদের আমল-আখলাক, বেশ-ভুষা, সুন্দর ব্যাবহার, মাধুর্যমণ্ডিত কাব্য-কথা ইত্যাদির মাধ্যমে ।
তথ্যসূত্র/ সহায়ক গ্রন্থঃ
১. “A History of Sufism in Bangal”, Anamul Haque.
২. বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস, ড. এম. এ. রহিম।